মোঃ মোছাদ্দেক হাওলাদার, বরিশাল ব্যুরো
দেশের উপকূলীয়ভাগ জুড়ে দূর্যোগপূর্ণ মৌসুম শুরু হলেও নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় শুন্যের কোঠায়। স্বাধীনতার ৫১ বছরেও উপক‚লভাগের বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপদ নৌ-যোগাযোগের বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ইতোমধ্যে কয়েকটি নৌ-দূর্ঘটনায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অতিসম্প্রতি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনার শাখা গজারিয়া নদীতে যাত্রীবাহী ট্রলার ডুবির ঘটনায় নারী ও শিশুসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশু জীবনের ঝু*কি নিয়ে মেঘনার মোহনা থেকে উপক‚লের প্রতিটি নদ-নদী পাড়ি দিচ্ছেন। এমনকি সাগর বক্ষের বিচ্ছিন্ন উপজেলা মনপুরা থেকে ২৪ ঘন্টায় মাত্র একবার ভোলার মূল ভু-খন্ডে পারাপারের সুযোগ রয়েছে ইজারা দেয়া সরকারী সী-ট্রাক ‘এসটি শেখ কামাল’র মাধ্যমে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ ও উপক‚লভাগে নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ নিশ্চিত করার জন্য ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্টের ১২ নম্বর আদেশে রাষ্ট্রীয় নৌ-বানিজ্য প্রতিষ্ঠান বিআইডবিøউটিসি গঠন করা হয়। এমনকি উপক‚লীয় নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সরকারী অর্থায়নে সংস্থাটি ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০০৯ সালে ১২টি নতুন সী-ট্রাক সংগ্রহ করে।
এছাড়াও বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে বিদ্যমান চারটি উপক‚লীয় নৌ-যানের দুটির পূণর্বাসনসহ ২০০২ সালে চীনা ঋণে আরও একটি এবং গতবছর সরকারের নিজস্ব তহবিলে আরও দুইটি উপক‚লীয় যাত্রীবাহী নৌযান সংগ্রহ করে সংস্থাটি। এছাড়াও বিশ^ ব্যাংকের সুপারিশে উপক‚লীয় নৌ-পথে যাত্রী পরিবহনে পরিচালন ব্যয়ের ওপর ভর্তুকি হিসেবে সরকার প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটিকে ৫০ লাখ টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছে। তারপরেও ২০১১ সালের মধ্যভাগ থেকে বন্ধ রয়েছে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপক‚লীয় নৌ-পথে যাত্রীবাহী স্টিমার সার্ভিস।
অথচ ২০০৯ সালে সরকারী প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ রুটের দুটি নৌ-যান পূণর্বাসন করা হয়। ইতোমধ্যে চীনা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট লাইনে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন উপক‚লীয় যাত্রীবাহী নৌ-যান সংগ্রহ করার পর দু’দফায় মেরামত ও পূণর্বাসনে আরও প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গতবছর আরও দুটি নতুন উপক‚লীয় নৌ-যান সংগ্রহ করা হয়।
সূত্রমতে, বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটের কথা বলেই সরকারী অর্থে তিনটি নতুন নৌ-যান সংগ্রহসহ আরও দুটির পূণর্বাসন করে বিআইডবিøউটিসি। এমনকি এসব নৌ-যানের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও ২০১১ সালের পর আর বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রী পরিবহন পূণর্বহাল করেনি সংস্থাটি।
অপরদিকে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের সুপারিশে সরকার প্রতিবছরের ১৬ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের উপক‚লকে ‘ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ এলাকা’ হিসেবে ঘোষনা করে আসছে। এ সময়ে উপক‚লীয় নৌ-যান হিসেবে বিশেষ কারিগরি ব্যবস্থা সম্বলিত নিবন্ধিত ছাড়া অন্যকোন নৌযান উপক‚লভাগে চলাচল নিষিদ্ধ। ফলে ইতোমধ্যে উপক‚লভাগে নৌ-যানের চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। তবে অনেক এলাকাতেই সরকারী বিধি নিষেধ উপেক্ষা করে চলছে অবৈধ নৌ-যান।
অপরদিকে বন্ধ হয়ে গেছে বরিশাল-ভোলা-লক্ষীপুর এবং ভোলা ও লক্ষীপুরের মধ্যবর্তী মির্জাকালু-চর আলেকজান্ডার রুটের সী-ট্রাক সার্ভিস দুটিও। বরগুনার চর দোয়ানীর সাথে পিরোজপুরের বড়মাছুয়া হয়ে বাগেরহাটের সণ্যাশী পর্যন্ত সী-ট্রাক সার্ভিসের মাধ্যমে অবহেলিত উপক‚লীয় এলাকাটির সাথে রাজধানীর নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার দাবীও দীর্ঘদিনের। তবে সংস্থাটির ১৪টি সী-ট্রাকের চারটি বিক্রির ব্যবস্থা চ‚ড়ান্ত হয়েছে। অপর ১০টির মধ্যে ‘এসটি খিজির-৫’ ও ‘এসটি-খিজির-৮’ ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে লক্ষীপুরের মজু চৌধুরীর হাট রুটে ইজারাদারের ব্যবস্থাপনায় চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, খিজির-৮ সী-ট্রাকটি বরিশাল-ভোলাÑলক্ষীপুর রুটের জন্য ইজারা নিয়ে সংস্থাটির কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজসে তা বরিশালের পরিবর্তে ভোলার ইলিশা থেকে লক্ষীপুর রুটে চালাচ্ছে ইজারাদার। এছাড়া ‘এসটি শেখ মণি’ হাতিয়া-বয়ার চর রুটে ইজারাদারের ব্যবস্থাপনায় যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে বলেও সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
এর বাইরে দীর্ঘদিন থেকে ‘এসটি ভাষা শহীদ জব্বার’ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ডকইয়ার্ডে মেরামতে রয়েছে। ‘এসটি-খিজির-৭’ ২০২০ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ভোলার একটি বেসরকারী নৌ-কারাখানায় মেরামতের নামে পরে রয়েছে। ‘এসটি শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত’ পাটুরিয়া ঘাটে গত ১০ ফেব্রæয়ারী থেকে পরে থাকার পরে অতিসম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ-নারায়নগঞ্জ রুটে যাত্রী পরিবহনে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ‘এসটি ভাষা শহীদ সালাম’ ও ‘এসটি সুকান্ত বাবু’ নামের দুটি সী-ট্রাকও ইজারাদারের ব্যবস্থাপনায় এতোদিন টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের পর কক্সবাজার ও টেকনাফে পরে রয়েছে। এ দুটি সী-ট্রাকও সংস্থার হিসেবে ইলিশা-মজুচৌধুরীর হাট রুটে যাত্রী পরিবহনের কথা রয়েছে।
সচেতন নাগরিক কমিটির বরিশাল জেলা সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, এসব সী-ট্রাকগুলো যথাযথ মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষনের মাধ্যমে সংস্থার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালন করা হলে তা উপক‚লীয় নৌ-যোগাযোগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।
এসব বিষয়ে বিআইডবিøউটিসি’র একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে আলাপ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, উপক‚লীয় নৌ-যোগাযোগ আরো নিরাপদ করতে আমরা আপ্রান চেষ্টা করছি। তারা আরও বলেন, ইচ্ছে থাকলেও নানাকারণে অনেক এলাকাতেই সংস্থার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সী-ট্রাক সার্ভিস পরিচালন সম্ভব নয় বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন।










