অনলাইন ডেস্কঃ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম ও পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করতো মনসুর আহমেদ (৩৩) ও তার দুই সহযোগী মহসিন চৌধুরী (৫৫) এবং সাইফুল ইসলাম (৪০)। তারা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন ও নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে এমন প্রতারণা করে আসেছিলো চক্রটি। অবশেষে চক্রের মূলহোতা মনসুর আহমেদ ও তার অন্যতম সহযোগী মহসিনকে রাজধানীর পল্টন থেকে গ্রেফতার করেছে র্যা ব। তবে সাইফুল সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকায় গ্রেফতার করা যায়নি তাকে। বুধবার (১৮ মে) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যা ব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি জানান, গত রাতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র্যা ব-৩ এর অভিযানে রাজধানীর পল্টন এলাকা থেকে প্রতারক চক্রের মূলহোতা মনসুর আহমেদ ও মহসিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। অভিযানে উদ্ধার করা হয় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন দলিল ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা প্রতারণা সম্পর্কে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছে।
কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেফতারকৃতরা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। এই চক্রে ৫/৭ জন সদস্য রয়েছে। চক্রের মূলহোতা গ্রেফতারকৃত মুনসুর। চক্রটি বিগত প্রায় ৩/৪ বছর যাবত বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেয়ার নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রতারিত করে আসছে। তারা প্রতারণার জন্য বিভিন্ন সময় নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করতো। প্রথমত তারা নতুন মোবাইল সীম ক্রয় করে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে সেভ করতো এবং নিজেরা ঐ ব্যক্তি সেজে নিজেদের প্রতারণা চক্রের সদস্যদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাটিং করতো। চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন মোবাইল নম্বর চক্রের মূলহোতা ও সহযোগির মোবাইলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নাম ও ছবি দিয়ে সেভ করে।
পরবর্তীতে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেয়ার ব্যপারে চ্যাটিং করে। এই চ্যাটিং কন্টেন্ট তারা এমনভাবে তৈরি করে যাতে যেকোন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মনে করে তারা ইতোপূর্বে অনেক কাজ অর্থের বিনিময়ে পাইয়ে দিয়েছে এবং তাদের বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের সাথে খুবই সু-সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, এই চক্রের একজন সদস্য তথাকথিত সাইফুল বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে। যে নিজেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারী পরিচয় দিত এবং সেখানে বসে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতো বলে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে। নিজেদেরকে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য তারা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে তাদের এডিট করা ছবি আগ্রহী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে দেখাতো। নিজেদের কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য হিসেবে উপস্থাপন করার লক্ষে তারা হাজার হাজার কেটি টাকার ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দেখাতো। তারা কোন অফিসে মিটিং এর সময় বেশভূষা পরিবর্তন করে দামি গাড়ি ও বডিগার্ড নিয়ে নিজেদের উপস্থাপন করতো। নিজেদেরকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করার জন্য তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে কাজের জন্য ভ্রমণ করেছেন মর্মে বিভিন্ন ছবি প্রদর্শন করতো।
গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে র্যা ব জানায়, তারা সরকারি কোন চলমান প্রকল্প সমূহের কাজ পাওয়ার যোগ্য এমন সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে বের করতো এবং তাদেরকে ১০% কমিশনের বিনিময়ে ঐ কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখাতো। তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমানের জন্য তাদের পূর্ব থেকে নির্ধারিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে তাদের ভাড়া করা অফিসে মিটিং করতো। আবার নিজেরা ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে ঐ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অফিসে যেতো। সেখানে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে তাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে মিথ্যা রেফারেন্স ব্যবহার করতো।
তারা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অধিকতর প্রমাণের জন্য চলমান সরকারি প্রকল্প সমূহে অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছে বলে ঐ সব প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করতো। যারা ইতোমধ্যে চলমান কোন সরকারি প্রকল্পের কাজ পেয়েছে। এক পর্যায়ে তারা বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সাথে করা ভুয়া চুক্তিপত্র, ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দেখাতো। এভাবে দীর্ঘদিন যাবত প্রতারণা কার্যক্রম চালিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারী প্রতারক চক্রটি বর্তমানে তিতাস নদী ড্রেজিং, আড়িয়াল খাঁ নদী ড্রেজিং ও নদীর তীর রক্ষা বাধ প্রকল্প, ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ড্রেনের সংস্কার কাজ, রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি অফিস কনস্ট্রাকশনের কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশনের কাজসহ প্রভৃতি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেয়ার নামে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতারণার পরিকল্পনা করছিল বলে গ্রেফতারকৃতরা জানায়।
গ্রেফতারকৃত মনসুর প্রথমে স্থানীয় এলাকায় জমির দালালি করত। পরবর্তীতে সে ঢাকায় একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী নেয়। সেখানে কর্মরত থাকাকালীন এভাবে প্রতারণার বিষয়টি তার মাথায় আসে। পরবর্তীতে ঐ প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীর মাধ্যমে সাইফুল এর সাথে পরিচয় হলে সে প্রতারণার জন্য এই চক্রটি গড়ে তোলে।
গ্রেফতারকৃত মহসিন প্রথমে ঢাকার মালিবাগে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ব্যবসা করত। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তার ফ্যাক্টরিটি বিক্রি করে দেয়। পরে মতিঝিলে মনসুরের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে এই প্রতারক চক্রের সাথে যুক্ত হয়। গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
সূত্রঃ বাংলা ভিশন।












