বরিশাল প্রতিনিধিঃ
বির্তক যেন পিছু ছাড়ছেনা বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর। মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার আগেই তিনি বরিশাল ত্যাগ করেছেন। প্রায় একমাস ধরে ঢাকায় অবস্থান করলেও মেয়র সাদিক আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী ও তার একমাত্র আপন চাচা খোকন সেরনিয়াবাতের জন্য বরিশাল আসেননি।
বরং তার (সাদিক) একান্ত ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া ছয় খলিফার জন্য প্রতিনিয়ত আরো বির্তকিত হচ্ছেন বর্তমান মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ। সর্বশেষ রবিবার (১৪ মে) দিবাগত রাতে নৌকার প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের চারজন কর্মীর ওপর হামলা চালিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করেছে সাদিক অনুসারী ও ছয় খলিফার অন্যতম একজন মহানগর ছাত্রলীগের আহবায়ক রইজ আহম্মেদ মান্না ও তার সহযোগিরা। নৌকার পক্ষে প্রচারনার অভিযোগে এ হামলা চালানো হয়। অপরদিকে রাতেই শেবাচিম হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ খবর নিতে ছুটে যান আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত। এরআগে একই অভিযোগে নৌকার সমর্থক অপর দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি প্রদর্শন করে মান্না। ওই ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অবশেষে থানা পুলিশ ঝটিকা অভিযান চালিয়ে রবিবার দিবাগত মধ্যরাতে মেয়র সাদিকের কালিবাড়িস্থ বাসার পেছন থেকে মহানগর ছাত্রলীগের আহবায়ক রইজ আহম্মেদ মান্নাসহ সাদিক অনুসারী ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
সোমবার (১৫ মে) সকালে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে কাউনিয়া থানা ওসি আব্দুর রহমান মুকুল জানান, আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতের কর্মীদের কুপিয়ে জখমের ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর ঝটিকা অভিযান চালিয়ে মহানগর ছাত্রলীগের আহবায়ক রইজ আহমেদ মান্নাসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নগরীর কাউনিয়া মহাশ্মশান এলাকার বাসিন্দা ও নৌকার সমর্থক জাহিদ ভূঁইয়া মনা বলেন, রবিবার সন্ধ্যা রাতে আমিসহ ৬/৭ জনে নগরীর উন্নয়নের স্বার্থে কাউনিয়া এলাকায় নৌকার পক্ষে ভোটারদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করছিলাম। আকস্মিকভাবে মহানগর ছাত্রলীগের আহবায়ক মান্নার নেতৃত্বে তার সহযোগিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। এসময় নৌকার পক্ষে এলাকাবাসির সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করায় আমাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের একপর্যায়ে মান্না পিস্তল বের করে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি প্রদর্শন করে। তার হুমকির প্রতিবাদ করায় মান্নার সাথে থাকা সহযোগিরা অর্তকিতভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আমাদের রক্তাক্ত জখম করে। হামলায় আমিসহ (মনা) নৌকার সমর্থক ৮ নাম্বার ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম, আওয়ামী লীগ কর্মী মো. জাহিদ ও সুজন আহমেদ গুরুত্বর আহত হয়েছেন।
আহত মনার ছেলে ইরফান আহম্মেদ বলেন, হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করেন। ইরফান আরও বলেন, বিগত সাড়ে চারবছর সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর প্রভাব বিস্তার করে মান্না ও তার সহযোগিরা এলাকার মানুষসহ পুরো নগরবাসীকে জিম্মি করে রেখেছে। এবার সাদিক আব্দুল্লাহ মনোনয়ন বঞ্চিত হবার পর এলাকাবাসী মান্নার জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হতে একত্রিত হয়ে নৌকার পক্ষে কোমড় বেঁধে মাঠে নামেন। আর এ কারনেই ক্ষিপ্ত হয়ে মান্না ও তার সহযোগিরা এ হামলা চালিয়েছে। সূত্রমতে, এর আগে গত ৬ মে রাতে নৌকার পক্ষে এলাকাবাসীকে নিয়ে মিছিল করায় মান্না পিস্তল ঠেকিয়ে নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের কর্মী মো. সোহাগসহ দুইজনকে প্রাণনাশের হুমকি প্রদর্শন করেন।
এ ব্যাপারে সরকারি বিএম কলেজের সাবেক ভিপি মঈন তুষার বলেন, যারা আমাদের একমাত্র রাজনৈতিক অভিভাবক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থীকে মানতে চাচ্ছেন না, তারা কিসের আওয়ামী লীগ। আসলে যারা আওয়ামী লীগের আদর্শকে বুকে ধারন করে বিরোধীদলের সময়কার দুর্দীন কাটিয়েছেন সেইসব নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে গোটা বরিশালজুড়ে একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য দলের বিভিন্নপদে সুবিধাভোগীদের বসানো হয়েছিলো। ওইসব দলছুট বিভিন্ন পদের লোকজনরাই তাদের ইন্ধনদাতা নেতার হুকুমে নৌকা ডুবাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু সচেতন বরিশালবাসীকে সাথে নিয়ে তাদের সেই স্বপ্ন সফল হতে দেওয়া হবেনা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিসিসি’র বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহকে সার্বক্ষণিক ঘিরে রাখতেন তার ছয়জন সঙ্গী। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না হলেও তারা মেয়রের প্রিয়জন। মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার কয়েকদিন আগে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির (রহ.) মাজার জিয়ারত করতে ভারতের আজমির শরিফ গিয়েছিলেন মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ। তখনও মেয়রের সঙ্গী ছিলেন ওই ছয়জন। তারা মেয়রের খলিফা হিসেবেই স্থানীয়ভাবে পরিচিত।
আলোচিত-সমালোচিত ওই ছয় নেতা হলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ সাঈদ আহমেদ মান্না, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল, মহানগর ছাত্রলীগের আহবায়ক রইজ আহমেদ মান্না, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আতিকুল্লাহ মুনিম, সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত ও জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রাজিব হোসেন খান। মেয়র পদে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে প্রায় এক মাস আগে বরিশালের রাজনীতিতে একক আধিপত্য হারিয়ে সাদিক আব্দুল্লাহ গত ৪ এপ্রিল থেকে ঢাকায় অবস্থান করলেও তার ছয় খলিফা বরিশালে আছেন। ওই ছয়জনকে নিয়েই চরম অস্বস্তিতে আছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী প্রধানমন্ত্রীর ফুফাতো ভাই ও সাদিকের চাচা আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতসহ তার অনুসারীরা।
মেয়র প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের অভিযোগ, গত সাড়ে চার বছর বরিশাল নগরীতে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, নগর ভবনে সেবা নিতে আসা নাগরিককে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায়সহ নানা অপকর্মের হোতা ছিলেন ওই ছয়জন। তারা ভোটের মাঠে থাকলে দুইধরনের ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। প্রথমত, তাদের দেখলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নৌকার প্রার্থী নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। দ্বিতীয়ত, হারানো আধিপত্য ফেরাতে নৌকার কর্মী সেজে তারা আত্মঘাতী কাজ করতে পারে।
এসব বিষয়ে নৌকার প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর আমিন উদ্দিন মোহন বলেন, বিগত সাড়ে চার বছরে বিতর্কিতরা আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। তারা ভোটের মাঠে থাকলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়বে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বিব্রতকর অবস্থায় মধ্যে রয়েছি। ইতোমধ্যে নৌকার পক্ষে কাজ করা একাধিক ব্যক্তিকে ওই বির্তকিতরা অস্ত্র ঠেকিয়ে হুমকি প্রদর্শন করেছে। সর্বশেষ চারজনের ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত জখম করেছে।
নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অপর সদস্য সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মঈন তুষার বলেন, ইউএনওর বাসভবনে হামলাসহ ভিন্নমত পোষণকারীদের ওপর হামলা-নির্যাতন ও দখল-চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিতেন মেয়রের ছয় খলিফা। এরমধ্যে কয়েকজনকে বিসিসি’র অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে বেতন দেওয়া হতো। প্রতিপক্ষের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর ও হয়রানি করতে বিসিসি কর্মচারী পরিচয়ে তাদের পাঠানো হতো।










