বরিশাল প্রতিনিধিঃ
বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটর দূরে অবস্থিত টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের বদিউল্লাহ গ্রাম। যার একপাশে রয়েছে একই ইউনিয়নের চরকেউটিয়া গ্রাম, আর অপর পাশে চরমোনাই ইউনিয়নের মীরাবাড়ি বাজারসহ গ্রামের একটি অংশ। আর এই গ্রামগুলোর মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে ফুলতলা (বুখাইনগর) নদীর ওপর খেয়া পাড় হয়ে ইউনিয়ন ও উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ করতে হতো। উপজেলা থেকে একটু বিচ্ছিন্ন এলাকা হওয়ায় এখানে হয়নি তেমন কোনো উন্নয়ন। এখনও মাটির রাস্তায় চলাচল করতে হয় গ্রামের মানুষকে। সেই সাথে খেয়া পারাপার জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একে তো এই তিন গ্রামজুড়ে মাটির রাস্তার আধিক্য বেশি। তার ওপর ইউনিয়ন ও উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ করতে হলে পাড়ি দিতে হয় নদী। ফলে বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ দ্বিগুণ হয়ে যায়। সেইসাথে রাত ৯টার পর খেয়া চলাচল না করায়, তখন এ অঞ্চলের মানুষ বরিশালের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ওই সময়ে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে ভোগান্তির যেমন শেষ থাকে না, তেমনি মুমূর্ষু অনেকেরই পথেই মৃত্যু হয়ে যায়।
তবে ইচ্ছে থাকলে যে উপায় হয়, তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন গ্রামের কিছু মানুষ। সম্প্রতি স্থানীয় কিছু মানুষের তৎপরতা ঐ গ্রামের মানুষের ভোগান্তি লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে শুরু করেছে। আর এমন উদ্যোগ বরিশালজুড়ে আলোচনারও সৃষ্টি করেছে।
স¤প্রতি টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের চরকেউটিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শামসুল আলম মাস্টার উদ্যোগ নিয়ে বুখাইনগর নদীর ওপর একটি কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করেন। পাশের বদিউল্লাহ গ্রাম ও মীরাবাড়ি বাজার সংলগ্ন এলাকায় আরও দুটি কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করেছেন স্থানীয়রা। ব্রিজ গুলো তৈরি করতে বাঁশ, কাঠ, লোহা ও রশির ব্যবহার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ওই ব্রিজ ব্যবহার করে এখন আশপাশের বেশকিছু গ্রামের মানুষ যাতায়াত করছেন আশপাশের ইউনিয়নসহ বরিশাল শহরে। ফলে বরিশাল সদরের চরমোনাই, টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নসহ পার্শবর্তী মেহেন্দিগঞ্জের জাঙ্গালিয়া, চরগোপালপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষেরও ভোগান্তি লাঘব পেয়েছে।
৩৩ বছর শিক্ষকতা শেষে সিংহেরকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়া শিক্ষক শামসুল আলম বলেন, টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের চরকেউটিয়া গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বঞ্চিত। অর্থাৎ আমরা পিছিয়ে পড়া জনপদের মানুষ। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব সময় ডাক্তার দেখানোসহ যেকোন কাজে আমাদের শহরে যেতে হয় বুখানইনগর নদী পাড় হয়ে। তাও আবার ছোট ডিঙ্গি নৌকার খেয়া পাড় হয়ে। এতে মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না। তাই একবার ২০০৩ সালে নিজ উদ্যোগে একটি বাঁশের সাঁকো বানিয়েছিলাম। কিন্তু আক্কাস মিয়ার লঞ্চ সেটিকে ভেঙে ফেলে দেয়। এরপর অবসরে এসে ২০২২ সালে নভেম্বরে আবারও উদ্যোগ নেই কিছু একটা করার। তবে এবার সাঁকো নয়, কাঠের ব্রিজ করবো এমন চিন্তা নিয়ে নামি। এরপর নিজের ও পরিবারের অন্য স্বজনদের সহায়তায় ৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা ব্যয়ে চরকেউটিয়া ও রাজারচর গ্রামের মাঝে সংযোগ ঘটিয়ে কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করি। এখানে এলাকাবাসীও ১৭-১৮ হাজার টাকা সহয়তা করেছে। আর এভাবে কাজ শেষে চলতি বছরের ৩ ফেব্রæয়ারি ২০০ ফুট লম্বা ব্রিজটি উদ্বোধন করা হয় এবং চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ফলে এখন অনায়াসে আমাদের গ্রামের মানুষ চরমোনাই হয়ে সড়কপথে বরিশাল যেতে পারছে।
এদিকে একই ইউনিয়ের বদিউলাহ গ্রামের সাথেও চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচরের সাথে সংযোগ ঘটাতে কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রিজ নির্মাণ কাজের উদ্যোক্তা মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসেন জানান, সাধারণ মানুষের জন্য যদি কিছু করা যায়, এমন চিন্তা থেকেই ভরাট হয়ে যাওয়া বুখাইনগর নদীর ওপর কাঠের ব্রিজ নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথা গত ফেব্রæয়ারি মাসে মসজিদে বসে গ্রামবাসীকে বলি। তখন তারা সবাই বিষয়টিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং যে যার মতো গাছ ও আর্থিক সহায়তার কথা জানান। বিভিন্ন মাধ্যমে সহযোগিতা পেয়ে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ শত ফুটের বেশি ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। ঈদের আগে মানুষের চলাচলের জন্য উন্মক্ত করে দেওয়া হবে। তবে এর আগে খেয়া পার হয়ে, নানান দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে জেলা সদরে যেতে হতো। কিন্তু এখন ব্রিজ পার হয়ে রাজারচর দিয়ে সড়কপথে সরাসরি বরিশাল শহরে যেতে পারবো।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তরিকুল ইসলাম সোহাগ মল্লিক বলেন, এমপি, মন্ত্রী কেউ খোঁজ নেননি আমাদের। তাই গ্রামবাসী মিলে যে উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, তার সাথে একত্মতা প্রকাশ করে আমিও ব্যক্তিগতভাবে ব্রিজ নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছি। তাতে যদি মানুষের ভোগান্তি কিছুটা কমে।










