ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
আজ ঝালকাঠি সদর উপজেলার নথুল্লাবাদ ইউনিয়নে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সফলগাঁথা এক রনাঙ্গন। একে ঝালকাঠি চাচৈর রনাঙ্গন হিসেবে পরিচিত এবং এবছর এর ৫৩তম বছর পূর্তি। বৃহত্তর বরিশালের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আর কোন রনাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা এই গৌরবময় সফলতা অর্জন করতে পারেননি। পাকবাহিনীর সাথে এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন সাফ সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমর বীর উত্তম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনভর এই যুদ্ধে তৎকালীন সেনাবাহিনীর সদ্য যোগদানকৃত সেনাসদস্য এই এলাকারই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আওয়াল শহিদ হন এবং হানাদার বাহিনী ১০ সেনাসদস্য ও শতাধিক রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়। দুই পক্ষের গোলাগুলি চলাকালিন সময়ে প্রমহর এলাকায় কয়েকজন সিভিলিয়ান শহিদ হন।
এই চাচৈর এলাকার জনৈক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, ঝালকাঠি তৎকালীন সেনাবাহিনীর দায়িত্বে থাকা পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনীর সদস্য এবং খন্ডকালীন প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সাথে নিয়ে আসা বিহারীদের নিয়ে ম্যালেশিযা বাহিনীর কাছে খবর দেয় চাচৈর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাটি রয়েছে। ঝালকাঠির দায়িত্বে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার খান সওবাদ খান এই ঝালকাঠি ইউনিটের দায়িত্বে ছিলেন। এই খবরের ভিত্তিতে পাকিস্তানী ম্যালেশিয়া বাহিনী রাজাকারদের নিয়ে চাচৈরে যায়। তৎকালীন সময় এই এলাকায় প্রত্যন্ত জনপদ থাকায় রাস্তাঘাট ছিল না নৌপথই একমাত্র যোগাযোগের সহজ পথ ছিল।
পাকবাহিনী গ্রামের চলাচলের ছিলা রাস্তা ধরে চাচৈরে এসে কথিত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প শরিফ বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। রাতে এখানে বীর উত্তম শাহজাহান ওমর তার বাহিনী নিয়ে অবস্থান করছিলেন। আকৃর্ষিক এই ঘটনায় শাহজাহান ওমর কৌশল অবলম্বন করে পিছের অংশে চলে যায় এবং আসেপাশের ইউনিট গুলিতে খবর দিয়ে চাচৈর গ্রামকে চারদিক থেকে ঘিরে ফিলে। একপর্যায়ে পাক ম্যালেশিয়া বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে চলে আসার মুহুর্তেই শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে সকাল ৯টায় পাকবাহিনীর উপরে আক্রমণ শুরু করে। পাকবাহিনী ঝালকাঠি বরিশালের ষাইটপাকিয়ায় তাদের যানবাহন রেখে পায়ে হেটে চাচৈরে প্রবেশ করেছিল।
এক পর্যায়ে চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে পাকবাহিনী পালিয়ে ষাইটপাকিয়ায় চলে আসতে শুরু করে। তারা ষাইটপাকিয়া খালকে ব্যবহার করে খালের পার ঘেষে পালিয়ে আসার চেষ্টা করে এবং এই সময় তাদের পাকবাহিনী ও রাজাকার গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হতে থাকে। সন্ধ্যার পূর্বেই পাক ম্যালেশিয়া বাহিনী নিহত সদস্যদের নিয়ে ষাইটপাকিয়ায় পালিয়ে এসে শহরের উপজেলা পরিষদে তাদের ইউনিটে ফিরে আসে। সকাল-সন্ধ্যা যুদ্ধচলাকালীন সময়ে শেষ মূহুর্তে বিকেল প্রমহর এলাকায় পলায়নকর পাকবাহিনীতে লক্ষ্য করে উত্তেজিত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আওয়াল দাড়িয়ে গুলি করাকালীন সমেয় সে প্রতিপক্ষের গুলিতে শহিদ হন।
এই ঘটনার পরদিন বরিশাল থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এসে চাচৈরসহ আশেপাশের গ্রামগুলি পুড়িয়ে দেয়। ১৯৯৩ সালের ঝালকাঠির সাংস্কৃতিক সমন্বয় পরিষদ উদ্যোগ নিয়ে এখানে চাচৈর প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন যুদ্ধের স্মৃতি ফলক স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সফলগাঁথা বিষয়ে বড় ধরণর কোন উদ্যোগ বা স্মৃতিফলক নির্মাণ করে চাচৈর রনাঙ্গনকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়নি।










