,বরিশাল প্রতিনিধিঃ
বহুল প্রতীক্ষার অবসান শেষ হয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ছাড়া কোনো ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনিত মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত বিপুল ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। নৌকা প্রতীকে তিনি ৮৭ হাজার ৭৫২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করিম হাতপাখা প্রতীকে পেয়েছেন ৩৪ হাজার ৩৪৫ ভোট। তাদের ভোটের ব্যবধান ৫৩ হাজার ৪০৭ ভোট। সোমবার (১২ জুন) সন্ধ্যায় রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. হুমায়ন কবির এ ফলাফল ঘোষণা করেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া মেয়র পদে অপর ৫ প্রতিদ্বন্দ্বীর মোট ভোটের ফলাফল এখন পর্যন্ত জানাযায়নি।
নগরীর ৩০ টি সাধারন ও ১০ টি সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন, ১ নম্বর ওয়ার্ডে আউয়াল মোল্লা, ২ নম্বরে মুন্না হাওলাদার, ৩ নম্বরে হাবিবুর রহমান ফারুক, ৪ নম্বরে সৈয়দ আবিদ, ৫ নম্বরে কেফায়েত হোসেন রনি, ৬ নম্বরে খান মোঃ জামাল হোসেন, ৭ নম্বরে রফিকুল ইসলাম খোকন (বিনাপ্রতিদ্বীতায়), ৮ নম্বরে সেলিম হাওলাদার, ৯ নম্বরে সৈয়দ হুমায়ন কবির লিংকু, ১০ নম্বরে জয়নাল আবেদীন, ১১ নম্বরে মজিবর রহমান, ১২ নম্বরে আনোয়ার রয়েল, ১৩ নম্বরে মেহেদী পারভেজ খান আবির, ১৪ নম্বরে শাকিল হোসেন পলাশ, ১৫ নম্বরে সামজিদুল কবির বাবু, ১৬ শাহিন সিকদার, ১৭ নম্বরে আক্তারুজ্জামান হিরু, ১৮ নম্বরে মাসুম হাওলাদার, ১৯ নম্বরে গাজী নঈমুল হোসেন লিটু, ২০ নম্বরে জিয়াউর রহমান বিপ্লব, ২১ নম্বরে সাইদ আহমেদ মান্না, ২২ নম্বরে আনিছুর রহমান দুলাল, ২৩ নম্বরে এনামুল হক বাহার, ২৪ নম্বরে ফিরোজ আহমেদ, ২৫ নম্বরে সুলতান মাহমুদ, ২৬ নম্বরে হুমায়ুন কবির, ২৭ নম্বরে মনিরুজ্জামান তালুকদার, ২৮ নম্বরে হুমায়ুন কবির, ২৯ নম্বরে ইমরান মোল্লা, ৩০ নম্বরে শাহিন হাওলাদার নির্বাচিত হয়েছে। সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১,২ ও ৩ নম্বরে ডালিয়া পারভীন, ৪,৫ ও ৬ নম্বরে আলম তাজ বেগম, ৭,৮ ও ৯ নম্বরে কোহিনুর বেগম, ১০,১১ ও ১২ নম্বরে আয়শা তৌহিদ লুনা, ১৩,১৪ ও ১৫ নম্বরে লাভলী বেগম, ১৬,১৭ ও ১৮ নম্বরে মজিদা বোরহান, ১৯,২০ ও ২১ নম্বরে শীলা আক্তার, ২২,২৩ ও ২৭ নম্বরে রেশমি বেগম, ২৪,২৫,২৬ নম্বরে সেলিনা বেগম, ২৮,২৯ ও ৩০ নম্বরে রাশিদা পারভিন নির্বাচিত হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনে কয়েটি স্থানে আওয়ামী লীগ ও ইসলামী আন্দোলন প্রার্থীদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটলেও ভোট কারচুপির কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে ভোট গণনার শেষ সময়ে এসে বরিশালে হাতপাখার মেয়র প্রার্থীর ওপর হামলার প্রতিবাদে খুলনা ও বরিশাল সিটি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান ঘোষনা করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সোমবার সন্ধ্যায় নগরীর চাঁদমারি এলাকায় দলটির প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষনা দেন দলটির আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম। একই সঙ্গে আসন্ন সিলেট ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বয়কট ঘোষণা করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সরকার ও নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে আগামী শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি।
সোমবার (১২ জুন) সকাল ৮টা থেকে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়; একটানা চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
এ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ছিল ১২৬ টি এবং ভোটকক্ষ ৮৯৪ টি। নগরীতে মোট ভোটার ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৮ জন। তাদের মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮০৯ জন। এছাড়া পুরুষ ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৪৮৯ জন।
ভোট দিতে আসেনি মেয়র সাদিক \ বরিশাল সিটি নির্বাচনে ভোট দিতে আসেনি বর্তমান মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকায় অবস্থানের কারণে তিনি বরিশাল সিটি নির্বাচনে ভোট দিতে আসেনি। সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনায়ন বঞ্চিত হওয়ার পরে অভিমান করে আর বরিশালে ফেরেননি মেয়র সাদিক বলে জানিয়েছে সূত্রটি। এদিকে তার চাচা আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত মনোনায়ন পাওয়ার পরে তার তার পক্ষে কাজ না করারও অভিযোগ রয়েছে সাদিক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে।
এসব বিষয় নিয়ে শুরু থেকেই নানা ধরনের অভিযোগ করেছে নৌকা প্রতীকের মনোনীত প্রার্থী আসছেন আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ। এমনকি নৌকার প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করারও অভিযোগ রয়েছে সাদিকের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
কেন্দ্রের ভেতরেই দুই কাউন্সিলর সমর্থকদের হাতাহাতি \ কেন্দ্রের ভেতরেই ভোট দিতে আসা লাটিম মার্কার প্রার্থী শাহরিয়ার সাচিব (রাজিব) এবং টিফিন বক্স মার্কার প্রার্থী শেখ সাঈদ আহমেদ (মান্না)-এর সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১২ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরিশালের ২১ নং ওয়ার্ডের গোরস্থান রোড মাদ্রাসা কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।
ভোট গ্রহণ শুরুর পর থেকেই দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে তর্কাতর্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এপিবিএন কর্মকর্তা দুলাল আহমেদ বলেন, ‘এখানে ঝামেলা হচ্ছে এমন খবর পেয়ে আমরা এসেছি। দুই কাউন্সিলরের লোকজনকে কেন্দ্রের সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পেলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
হাতপাখার প্রার্থী ও কর্মীদের উপর হামলা \ বরিশালে হাতপাখার প্রার্থী ও কর্মী সমর্থকদের উপর কয়েক দফায় হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রথমে কাউনিয়া রোডের সামনে কর্মীসমর্থকদের উপর হামলার পরে নগরীর চৌমাথা এলাকায় হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। আহত অবস্থায় তিনি রিটানিং অফিস ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যলয়ের স্বশরীরে অভিযোগ জানিয়েছেন।
হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম জানান, ছাবেরা খাতুন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর হাতেম আলী কলেজ চৌমাথার কাছে ৩০ থেকে ৪০ জন নৌকা সমর্থক তার ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এ সময় তারা লাঠিসোঁটা ও পাথর ব্যবহার করে। তার সঙ্গে থাকা বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী এ সময় আহত হন।
নগরীজুড়ে বহিরাগতদের আনাগোনা, কেন্দ্রে কেন্দ্রে বিবেধ \ নির্বাচনের দিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বরিশাল নগরীতে বাড়ে বহিরাগতদের আনাগোনা। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নির্বাচনের একদিন আগে প্রেস ব্রিফিং করে বহিরাগতদের বরিশাল ছাড়ার নির্দেশ দিলেও বহিরাগতরা গাঁ ঢাকা দিয়ে আজকে ভোর থেকে ভোটকেন্দ্রে আসতে শুরু করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে নৌকা ও হতপাখা বহিরাগতদের দেখা গেছে। বেলা বাড়তে থাকলে হাতপাখার-কর্মী সমর্থকদের সাথে নৌকার প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের বিবেধ শুরু হয়। ঘটে হামলার ঘটনাও। হামলায় হাতপাখার প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করিমসহ একাধিক কর্মীরা আহত হয়। ফলে বরিশাল নগরজুড়ে উত্তেজনাকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া লাঙ্গল মার্কার মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস তার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে হাতাহাতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাংবাদিকদের। তিনি অভিযোগ করেন, অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপন একই অভিযোগ করে বলেন, তার এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না এবং ভোটারদের কেন্দ্রে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করছে।
লাঠিসোঁটা নিয়ে শহরে ঢোকার চেষ্টা হাতপাখা কর্মীদের \ বরিশাল সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিমের ওপর হামলার খবরে হাতপাখার কর্মী-সমর্থক বরিশাল শহরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মো. আফজালুল করিম এ অভিযোগ করেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দপদপিয়া সেতু বন্ধ করে দেওয়ায় তারা শহরে প্রবেশ করতে পারছেন না। তারা সেতুর অপরপ্রান্তে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হয়েছেন। সেইসঙ্গে নদীর ওপাশ থেকে যেন কেউ শহরে ঢুকতে না পারে সে জন্য নৌ-পুলিশ দিয়ে প্রতিহত করা হচ্ছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান।
জানাগেছে, হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে চরমোনাই মাদ্রাসার ছাত্ররা লাঠিসোঁটা নিয়ে বরিশাল শহরের দিকে রওনা হন। বেলতলা খেয়াঘাট বন্ধ থাকায় সড়কপথে প্রায় ২০ কিলোমিটার ঘুরে তারা বরিশাল শহরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় তাদের অনেকের হাতেই লাঠিসোঁটা দেখা যায়।
হামলার প্রতিবাদে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিবাদ \ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীর ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা। সোমবার (১২ জুন) দুপুর দুইটার দিকে এয়ারপোর্ট থানার কাশিপুর এলাকায় বিক্ষোভ করেন তারা।
আন্দোলনকারীরা বলেন, মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিমের ওপর প্রকাশ্যে হামলা করা হয়েছে। আমরা হামলাকারীদের বিচার চাই। এখন নির্বাচন চলছে, আমরা নির্দেশ ছাড়া ভোটের মাঠ থেকে সরে যাব না।
এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা সড়কে বিক্ষোভ করেছেন। তাদের বুঝিয়ে নিবৃত করা হয়েছে। কাশিপুরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।










