বরিশাল প্রতিনিধিঃ
জেলার মুলাদী উপজেলার আলোচিত জোড়া খুনের ঘটনার চারদিন পরেও দায়ের করা হয়নি কোন মামলা। তবে সরকারি কাজে বাঁধা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ বাদি হয়ে দায়ের করা ওই মামলায় প্রায় দুইশ’ জনকে আসামি করা হয়েছে। এমনকি ওই মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজত প্রেরণ করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে মুলাদী থানার ওসি তুষার কুমার মন্ডল বলেন, ময়নাতদন্তের পর নিহত দুই ব্যক্তির মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় এখনও কোনো পরিবারের পক্ষ থেকেই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ওসি আরও বলেন, পুলিশ যেকোনো কাজই সাধারণ ডায়েরীর ওপর ভিত্তি করে করে। নিহতদের পরিবার যদি মামলা দায়ের না করে তবে হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়েও মামলা দিতে পারবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত দেবেন।
ওসি তুষার কুমার মন্ডল বলেন, সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে সরকারি কাজে বাঁধা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই মামলায় জামাল সরদার নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। পাশাপাশি ঘটনার দিন রাতে নিজ এলাকা থেকে পাশ্ববর্তী গৌরনদী থানা এলাকা হয়ে পালানোর সময় গৌরনদী মডেল থানা পুলিশের হাতে আটক হওয়া বাটামারা ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলম বেপারীকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।
বাটামারা অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পের এসআই বেল্লাল হোসেন মাতুব্বর বাদি হয়ে মুলাদী থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১০ এপ্রিল বিকেল পৌনে তিনটার দিকে মুলাদীর সফিপুর ইউনিয়নের উত্তর বালিয়াতলী এলাকায়। ওইদিন মুলাদী থানার ওসি তুষার কুমার মন্ডল ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সমীর কুমার দাসের নেতৃত্বে বাটামারা ও সফিপুর ইউনিয়নে নিয়মিত মামলা ও ওয়ারেন্টভূক্ত পলাতক আসামি গ্রেপ্তার ও মাদক উদ্ধারের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিকেলে সফিপুর ইউনিয়নের উত্তর বালিয়াতলী এলাকার জামাল সরদারের বাড়িতে অভিযানের সময় গ্রেপ্তার এড়াতে আসামিরা পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় আসামিদের লাঠি এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কনস্টেবল মো. নাঈম আহত হয়। পরে আসামিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি বোমা বিস্ফোরণ ঘটান। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে শর্টগান দিয়ে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এসময় জামাল সরদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সূত্রমতে, এর বাহিরে পুলিশের দায়ের করা মামলার এজাহারে আর কোনো তথ্য না থাকলেও ওই ঘটনায় ৫৫ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরো ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
নিহত আলমগীর কবিরাজের ছেলে সোহরাব হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ইউপি সদস্য আলম বেপারীসহ হাওলাদার ও হাজী গ্রæপ দীর্ঘদিন থেকে সফিপুর ও বাটামারা ইউনিয়নে সন্ত্রাসী গ্রæপ তৈরি করেছেন। আলম ওই গ্রæপের প্রধান। তারা এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে মানুষকে মারধরসহ চাঁদাবাজি করে আসছিলো। নিহত আলমগীরের স্ত্রী রাবেয়া বেগম বলেন, হামলাকারীরা এতোই বেপরোয়া যে পুলিশের উপস্থিতিতে গত ১০ এপ্রিল বোমা হামলা চালিয়ে দুইজনকে ধরে নিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে।
অপর নিহত হেলাল বেপারীর স্বজনরা জানিয়েছেন, হাজী গ্রæপের লোকজনে পুলিশের উপস্থিতিতে তিনজনকে ধরে নিয়ে যাবার পর হেলাল ও আলমগীরের লাশ পাওয়া গেলেও সন্ধান মিলছে না নিহত হেলালের ভাই কবির বেপারীর। তবে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, কবির বেপারীকে গুরুত্বর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে মাদারীপুরের কোনো একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। অজানা আতঙ্কে স্বজনরা তাকে এখনই প্রকাশ্যে আনতে চাচ্ছেন না।
নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ১০ এপ্রিলের ঘটনার আগে আলম মেম্বারের মাধ্যমে হাজী গ্রæপের দাদন হাওলাদারসহ অন্যান্যরা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে এলাকায় আসেন। ঘটনারদিন মাদকবিরোধী বা অন্য কোনো অভিযানের বিষয়ে স্থানীয়রা কিছুই জানেন না। তাই এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাঝে দাবি করেছেন নিহতদের পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
উল্লেখ্য, ওই এলাকায় হাজী গ্রæপ ও আকন গ্রæপের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র বিরোধ চলে আসছে। তারই জেরধরে গত ১০ এপ্রিল হাজী গ্রæপের সদস্যরা বাটামারা ইউনিয়নের পূর্ব তয়কা গ্রাম থেকে আকন গ্রæপের সমর্থক সফিপুর ইউনিয়নের উত্তর বালিয়াতলী গ্রামের জলিল কবিরাজের ছেলে আলমগীর কবিরাজ ও পূর্ব তয়কা গ্রামের বাসিন্দা সেলিম বেপারীর ছেলে হেলাল বেপারীকে ধরে নিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। একই সময় নিখোঁজ হন নিহত হেলালের ভাই কামাল বেপারী।










