আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
পদ্মা সেতু চালু হবার সুবাদে সড়ক পথে সকালের পেয়ারা বিকেলের মধ্যেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌছে। ভাসমান পেয়ারা বাজার বিখ্যাত থাকলেও পেয়ারারাজ্যের সবচেয়ে বড় মোকাম ভীমরুলীতে প্রবেশের পথে পথে রাস্তার পাশের খালেই নৌকায় পেয়ারার পসরা নিয়ে পাইকারদের কাছে তুলে দিচ্ছেন। প্রতিমণ পেয়ারার দাম আকার ও রং ভেদে ৩শ থেকে সাড়ে ৪শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন চাষীরা।
একারণে ভাসমান হাট হিসেবে বিখ্যাত থাকলেও ভীমরুলীর বড় মোকাম ভাসমান হাটে ডিঙি নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আগের থেকে চাষীদের আনাগোনা কম। ঝালকাঠি শহর থেকে প্রায় ১০কিলোমিটার দূরত্বের সড়কের পাশে ১০টিরও বেশি মোকামে পেয়ারা ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। পেয়ারার দাম প্রতিবছরের চেয়ে ভালো পেলেও ফলন কম হওয়ায় কৃষকের অনন্দ নিরানন্দই থেকে যাচ্ছে। মৌসূমের শুরুতে বৃষ্টি না হওয়ায় ফুল ঝরে যাওয়ায় ফলন বিপর্যয়ে প্রতিবছরের চেয়ে এবছর পেয়ারার সমারোহ কম। পেয়ারা উৎপাদনে বিখ্যাত ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বানরিপাড়ার ৫৫টি গ্রাম। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষায় এ অঞ্চলের নদী খালের পাড়ে সজ্জন পদ্ধতিতে সৃজিত পেয়ারাগাছে ঝুলে সবুজ ফল।
জানাগেছে, ঝালকাঠি, বানারিপাড়া ও স্বরূপকাঠি উপজেলার ৫৫ গ্রামে ফলন হয় পেয়ারার। এই এলাকার হাজার হাজার মানুষের কাছে ‘পেয়ারা’ অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ ও জীবিকার অবলম্বন। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষায় এসব এলাকার নদী-খালজুড়ে পেয়ারার সমারোহ। দেরিতে ফুল আসলেও অনাবৃষ্টিতে সেই ফুল অনেকটাই ঝরে গেছে। আষাঢ়ে পেয়ারা পাকার মৌসূম থাকলেও শ্রাবণের শুরুতে পেয়ারা পরিপক্ক হওয়ায় এখন জমে উঠেছে পেয়ারার হাট। ভিমরুলী, শতদশকাঠী, খাজুরিয়া, ডুমুরিয়া, কাপুড়াকাঠী, জগদীশপুর এলাকা ঘুরে কৃষকদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বরিশাল বিভাগের কম-বেশি সবজায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পেয়ারার চাষ হলেও বরিশাল জেলার বানারীপাড়া, ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি ঘিরেই মূলত পেয়ারার বাণিজ্যিক চাষ। বরিশাল জেলার বানারীপাড়ার ১৬ গ্রামে ৯৩৭ হেক্টর, ঝালকাঠি জেলার ১৩ গ্রামে ৩৫০ হেক্টর জমিতে, স্বরূপকাঠির ২৬ গ্রামের ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। এসব এলাকার মধ্যে ঝালকাঠির কীর্ত্তিপাশা, ভিমরুলী, শতদশকাঠী, খাজুরিয়া, ডুমুরিয়া, কাপুড়াকাঠি, জগদীশপুর, মীরকাঠি, শাখা গাছির, হিমানন্দকাঠি, আদাকাঠি, রামপুর, শিমুলেশ্বর এই গ্রামে বৃহৎ অংশজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে যুগ যুগ ধরে পেয়ারার চাষ হচ্ছে। স্বরূপকাঠির ২৬ গ্রামের মধ্যে রয়েছে সঙ্গীতকাঠি, খায়েরকাঠি, ভদ্রানন্দ, বাচ্চুকাঠি, ভাংগুরা, আদাবাড়ি, রাজাপুর, ব্রাহ্মণকাঠি, ধলহার, জিন্দাকাঠি, আটঘর, কুড়িয়ানা, পূর্ব জলাবাড়ি, ইদিলকাঠি, আরামকাঠি, মাদ্রা, গণপতিকাঠি, আতাকাঠি, জামুয়া, জৈলশার, সোহাগদল, আদমকাঠি, অশ্বত্থকাঠি, সমীত, সেহাংগল, আন্দারকুল। বরিশালের বানারীপাড়ার পেয়ারা বাগানগুলো হলো তেতলা, সৈয়দকাঠি, মালিকান্দা, ব্রাহ্মণবাড়ি, বোয়ালিয়া, জম্বুদ্বীপ, বিশারকান্দি, মরিচবুনিয়া, মুরার বাড়ি, উমরের পাড়, লবণ সড়া, ইন্দির হাওলা, নরেরকাঠি, রাজ্জাকপুর, হলতা, চুয়ারিপাড়।
এসব গ্রামের কয়েক হাজার কর্মজীবী পরিবার যুগ যুগ ধরে পেয়ারার চাষ করছে। পেয়ারার চাষ, ব্যবসা ও বাজারজাতকরণেও রয়েছে কয়েক হাজার মৌসুমী বেপারি এবং শ্রমিক। এ সময় অন্তত কুড়িটি স্থানে পেয়ারার মৌসুমী মোকামের সৃষ্টি হয়। এরমধ্যে আবার সড়কপথেও ১০টিরও বেশি মোকামে ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। এগুলো হলো ভিমরুলী, আতাকাঠী, ডুমুরিয়া, গণপতিকাঠী, শতদশকাঠী, রাজাপুর, মাদ্রা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি, বর্ণপতিকাঠি, আটঘর, কুড়িয়ানা, আন্দাকুল, রায়ের হাট, ব্রাহ্মণকাঠি, ধলহার, বাউকাঠি। এসব মোকামে মৌসুমে প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ হাজার মণ পেয়ারা কেনা-বেচা হয়ে থাকে।
স্থানীয় চাষীরা জানান, আনুমানিক ২শ বছরেরও বেশি সময় আগে বিচ্ছিন্ন আবাদ হলেও ১৯৪০ সাল থেকে শুরু হয়েছে পেয়ারার বাণিজ্যিক আবাদ। এই আবাদ ক্রমশ বাড়ছে। ২০২২ সালে অন্তত ১৯৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক পেয়ারার আবাদ হয়েছে। এ সময় ফলন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিকটন পেয়ারা। কিন্তু এবছর ফলন কম হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ১০হাজার মেট্রিকটন পেয়ারা উৎপাদন হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বলে হতাশা প্রকাশ করেন পেয়ারা চাষীরা।
বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসেই পেয়ারা গাছে ফুল আসতে শুরু করে। তবে বৃষ্টি শুরু না হলে পেয়ারা পরিপক্ক হয় না। জমি ভালো হলে হেক্টর প্রতি ১২ থেকে ১৪ মেট্রিকটন পেয়ারার উৎপাদন হয়। কিন্তু এবছর জ্যেষ্ঠ মাসে অনাবৃষ্টির কারণে ফুল ঝড়ে যাওয়ায় পেয়ারার ফলন অনেক কম হয়েছে।
কৃষক পঙ্কজ বড়াল জানান, মাঘ-ফাল্গুন মাসে পেয়ারা গাছের গোড়া পরিস্কার করে সার প্রয়োগ করতে হয়েছে। এরপরে কাঁদা মাটি দিয়ে গোড়া ঢেকে দিয়েছি। তাতে প্রতিটা গাছের গোড়ায় গড়ে তিনশতাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে। পেয়ারা গাছে যে পরিমাণ ফুল এসেছিলো এবছর বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তা অনেকটাই ঝড়ে গেছে। লাভ তো দূরের কথা, আসল খরচের টাকাই ওঠে কি না তাই নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানালেন এই কৃষক।
কৃষক দেবব্রত হালদার বিটু জানান, পেয়ারা আমাদের মৌসূমী আয়ের একমাত্র অবলম্বন। পেয়ারার ফলন ভালো হলে আমাদের স্বচ্ছলতা আসে। পানির উপরেই ভাসমান হাটে বছরে কোটি টাকার লেনদেন হয়। অস্থায়ী কিছু দোকান পাট বসে পাইকার, পর্যটক/দর্শনার্থীদের আপ্যায়নের বা ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যমে ব্যবসার করে আর্থিকভাবে লাভবান হন বিক্রেতারা। আরেক কৃষক বিপুল চক্রবর্তি জানান, আমরা সংসারে ৩জন পুরুষ পেয়ারা বাগানের পরিচর্যাসহ সব ধরনের কাজে নিয়োজিত থাকি। বছরের এ মৌসূমটাতে আমাদের আয় দ্বারা সারা বছর সংসার চলে। পর্যটক ব্যবসায়ী নিশিথ হালদার শানু জানান, পেয়ারা মৌসূমকে ঘিরে দেশি-বিদেশী হাজার হাজার পর্যটক আসেন। আগে শুধুমাত্র নৌপথে আসতো, এখন পদ্মা সেতু উদ্বোধন হবার পরে সড়ক পথ ভালো হওয়ায় অল্পসময়ের মধ্যেই যাতায়াত সম্ভব বলে পর্যটকদের সংখ্যা গতবছর থেকে বাড়ছে। পেয়ারাচাষীদের বাগানে ঢুকে ক্ষতি সাধন হওয়ায় আমরা পেয়ারা বাগানে নান্দনিক ভ্রমণের সুযোগ করেছি। কারণ পর্যটক বা দর্শনার্থীরা ঘুরে ফিরে যাবার সময় কিছু পরিমাণ পেয়ারা কিনে নিয়ে যান বাড়ি বা বাসার জন্য।
পেয়ারাচাষী ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ভবেন হালদার জানান, কৃষির ফলনে সবচেয়ে সুবিধাজনক হলো স্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টি। কিন্তু এবছর পেয়ারা গাছের পরিচর্যা সঠিকভাবে করা হলেও বৃষ্টি না থাকায় যে পরিমাণে ফুল এসেছিলো তার বেশিরভাগই ঝড়ে গেছে। এখন পেয়ারা গাছে যে পরিমাণ ফল হয়েছে তাতে দাম ভালো পাচ্ছি কিন্তু খরচের তুলনায় বিক্রিত টাকায় পোষানোই দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলায় ১৩ গ্রামে ৩৫০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ হয়। পেয়ারা মৌসূমে এলাকার হাজার হাজার মানুষের কাছে ‘পেয়ারা’ অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ ও জীবিকার অবলম্বন। পদ্মা সেতুর কারণে সড়ক পথে দিনের মধ্যেই পেয়ারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌছে। ফলন কম হলেও চাষীরা ভালো দাম পাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।










