বরিশাল প্রতিনিধিঃ
সিটি করর্পোরেশনে অনেকেই মেয়র ছিলো কিন্তু আমরা খাইয়া আছি নাকি না খাইয়া আছি কখনও কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি। মেয়র হিরণের সময়ে আমাদের কিছু কাজ হইছে, এরপর আরও মেয়র ছিলো কিন্তু আমাগো কোনো কাজ হয়নি। তারা তৃতীয় লিঙ্গের বাসিন্দাদের কোনো খোঁজ পর্যন্ত রাখেননি। এমনকি কোন নির্বাচনের সময়ও আমাদের কাছে কেউ ভোট চাইতে আসেনি। তবে এবারই প্রথম নৌকা মার্কার প্রার্থীর স্ত্রী আমাগো কাছে আইস্যা খোঁজখবর নেওয়ার কথা বইল্যাও গেছে। তিনি বলেছেন, আমাদের নিয়ে কাজ করবেন। তাই আমরা মেয়র হিরণের মতো এবার আবার আরেকজন মেয়র পেতে যাচ্ছি বলে অনেকটা আশাবাদী।
একান্ত আলাপকালে কথাগুলো বলেছেন, নগরীর রসুলপুর কলোনির বাসিন্দা তৃতীয় লিঙ্গের ছালমা আক্তার। সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত দ্বিতীয় পরিষদের সাবেক মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণকে স্মরণ করে তৃতীয় লিঙ্গের শান্তা আক্তার বলেন, শুধুমাত্র হিরণ ভাই মেয়র থাকাবস্থায় আমাগো জন্য অনেক কাজ করেছে। আমাগো জন্য যে কাজ করবে, সুখে-দুঃখে আমাগো পাশে থাকবে, আমরাও তার পাশে থাকমু। এজন্য শুধু আমাদের ভোটই নয়; প্রয়োজনে মাঠে নেমে অপর ভোটারদের পা ধরে ভোট চেয়ে আনবো।
কিউট নামে তৃতীয় লিঙ্গের আরেকজন বলেন, বিভিন্ন জায়গায় সরকার তৃতীয় লিঙ্গের জন্য নানান সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে কিন্তু আমরা এখানে আমাদের নিজেদের যোগ্যতায় ভালো থাকার চেষ্টা করছি। তাই জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে আমাদের কোন আশা নেই। এরইমধ্যে আসন্ন সিটি নির্বাচনে এবারই সর্বপ্রথম আমাদের কাছে ছুঁটে এসেছেন নৌকার প্রার্থীর স্ত্রী। তাই এবার মনে অনেক আশা বেঁধেছি। এবার হয়তো আমাদের অভিভাবক হিসেবে কাউকে পাশে পাবো।
রসুলপুর কলোনিতে বসবাসকারী তৃতীয় লিঙ্গের বয়োজ্যেষ্ঠ কবির সিকদার কবরী। যাকে স্থানীয়ভাবে তৃতীয় লিঙ্গের অন্যরা গুরুমা ডাকেন। তিনি বলেন, আমাদের চাওয়া-পাওয়াতো অনেক বেশি না। আমরা অন্য মানুষগুলোর মতো স্বাভাবিকভাবেই থাকতে চাই। আর এ চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে যে আমাদের পাশে থাকবে তাদের পাশে আমাদের থাকতে দোষ কী। তিনি আরও বলেন, ভোটের আগে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণ আমাদের কাছে যেমন আসছিল। তিনি মেয়র হওয়ার পরেও আসতো, আমাদের সুখ-দুঃখের খোঁজ খবর নিতো। কলোনিতে বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজও সেই করছে। সে বেঁচে থাকলে হয়তো আমরা আরও ভালো থাকতাম। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আর কেউ আমাদের কাছে আসেনি। তবে এবার আওয়ামী লীগের যে প্রার্থী হইছে তার স্ত্রী লুনা আব্দুল্লাহ আমাগো ধারে এসে দোয়া চেয়েছে। তার স্বামীর (মেয়র প্রার্থী) জন্য দোয়া ও ভোট চেয়েছেন। একইসাথে নির্বাচনী প্রচার প্রচারনায় সহযোগিতা চেয়েছেন। সেই সঙ্গে পাশে থাকার কথাও বলেছেন। খুব ভালো লাগছে তিনি আমাগো সবাইরে একসাথে নিয়ে নাস্তাও খাইছেন। এমন মানুষ দিয়াই আবার একজন হিরণ মেয়র পাবো। তাই আমরা তৃতীয় লিঙ্গের অর্ধশতাধিক ভোটাররা তাকেই সমর্থন দিয়েছি।
নারীনেত্রী ডা. শাহনাজ রুবি জনকণ্ঠকে বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের বলে ওদের সবাই এড়িয়ে চলতে চায়। যদিও গত কয়েকবছরে এ মনোভাব কিছুটা কমেছে। তবে দীর্ঘদিন পর কোনো মেয়র প্রার্থীর সহধর্মীনিকে প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের কাছে যেতে দেখে খুব ভাল লেগেছে। আগে মেয়র হিরণ ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেছা আফরোজকে ওদের খোঁজ নিতে দেখেছি। আর এরপর দেখলাম খোকন সেরনিয়াবাতের স্ত্রী লুনা আব্দুল্লাহকে। তাকে (লুনা) কাছে পেয়ে তৃতীয় লিঙ্গের ওরা খুব খুশি হয়েছে। তাকে ওরা নাস্তাও করাইছে, খুব সম্মান দেখাইছে। লুনা আব্দুল্লাহকেও দেখেছি ওদের ঘরের মেঝেতে বসে সবার সাথে মায়ের ¯েœহে কথা বলেছে, ওদের সবাইকে নিয়ে একসাথে নাস্তা খেয়েছে। ওরা এর চেয়ে বেশি কিছু চায় না।
অপরদিকে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে সিটি নির্বাচনে নৌকার মেয়র প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের স্ত্রী লুনা আব্দুল্লাহ জনকণ্ঠকে বলেন, শুধু ভোট নয়; আমি চাই সমাজের সবাইকে নিয়ে একসাথে দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে। তাই ভোটের চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, মানুষের খোঁজ নেওয়া। তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে তাদের কাছে আসা যাবেনা, প্রার্থীর জন্য দোয়া চাওয়া যাবেনা, এমনটা হওয়া উচিত হয়।
তিনি আরও বলেন, আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ভোটের অধিকার দিয়েছেন, বাড়ি-ঘর করে দিয়েছেন। এছাড়া তাদের কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও ভাতা দিচ্ছেন। আমিও তাদের কাছে এসেছি, তাদের কথা শুনেছি। তারা যাতে সামনের দিকে আরো এগিয়ে যেতে পারে, তাদের কর্মসংস্থান হয়, ভাতা পায় সে চেষ্টা থাকবে। বরিশালে আগে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি, এটা শুনে আমিও অবাক হয়েছি। আগামীতে তাদের জন্য আমরা ভালো কিছু করার চেষ্টা করবো।










