দেশে সবুজ শিল্পায়নের লক্ষ্যে বিসিক ২০৪১ সাল নাগাদ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সবুজ শিল্পায়নের পাশাপাশি দেশব্যাপী শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাগণ শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত হবেন।
১১ জানুয়ারি বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
এমপি মোরশেদ আলম প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুগ্রহ করে বলবেন কী, দেশে সবুজ শিল্পায়ন ও পণ্যের মান রক্ষার লক্ষ্যে শিল্প উদ্যোক্তাদের সরকার কোনো তাগিদ দেবে কিনা; এবং আগামী প্রজন্ম ও জাতির স্বার্থে দেশে দেশে সবুজ শিল্পায়ন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের কৌশলগত উদ্দেশ্য ৩ দশমিক ২৩ মোতাবেক পরিবেশবান্ধব শিল্প উৎপাদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ সুরক্ষা করা একটি অন্যতম অঙ্গীকার। নির্বাচনি ইশতেহারের কৌশলগত উদ্দেশ্য মোতাবেক শিল্প মন্ত্রণালয় পরিবেশবান্ধব শিল্প উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও আওতাধীন দপ্তর-সংস্থা টেকসই পরিবেশবান্ধব ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমে এসডিজি-২০৩০ এবং রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এসময় তিনি দেশে সবুজ শিল্পায়ন ও পণ্যের মান বজায় রাখার লক্ষ্যে সরকার নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। এগুলো হলো-
● জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ প্রণয়ন করা হয়েছে। উক্ত নীতিমালায় অধ্যায় ১৭-এ পরিবেশবান্ধব শিল্প ব্যবস্থাপনা এবং অধ্যায় ১১-এ পণ্যের গুণগত উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়াও মন্ত্রণালয় প্রণীত অন্যান্য নীতিমালা-নির্দেশনায় সবুজ শিল্পায়ন ও মানসম্পন্ন পণ্যের কথা বলা হয়েছে।
● বিসিকের বিভিন্ন শিল্পনগরীতে অবস্থিত ১৪৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করেছে। যে সকল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ইটিপি স্থাপন করেনি বা ইটিপি বন্ধ রেখে পরিবেশ দূষণ করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে বিসিক জেলা প্লট বরাদ্দ কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বিসিকের নতুন স্থাপিত মনোটাইপ শিল্পনগরীসমূহের লে-আউট প্ল্যানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী জায়গা সংস্থান রাখা হচ্ছে।
● পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, জনসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর লক্ষ্যে বিসিক কর্তৃক হোসিয়ারি শিল্পনগরী, নারায়ণগঞ্জ; জামদানি শিল্পনগরী, নারায়ণগঞ্জ; চামড়া শিল্পনগরী, সাভার; এপিআই শিল্পপার্ক, মুন্সিগঞ্জ এবং বিসিক বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরী, মুন্সিগঞ্জ শীর্ষক বিশেষায়িত শিল্পনগরী-শিল্পপার্ক বাস্তবায়িত হয়েছে।
● বর্তমানে বিসিকের চলমান প্রকল্পগুলোতে সবুজায়নের বিষয়টিকে গুরুত্ব প্রদান করে গ্রিন জোন, জলাধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হচ্ছে। শিল্পনগরীসমূহে গ্রিন জোন এবং পুকুরের জন্য জায়গা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। গ্রিন জোন এবং শিল্পনগরীসমূহের অন্যান্য ফাকা জায়গায় বৃক্ষরোপণ অব্যাহত রয়েছে। ৩০ নভেম্বর, ২০২২ পর্যন্ত বিসিক, বিসিআইসি এবং বিএসইসি-এর সকল শিল্পনগরীতে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৪২৫টি বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। বিসিকের প্রক্রিয়াধীন এবং প্রস্তাবিত শিল্পনগরী শিল্পপার্কসমূহে ভূমির রূপ ঠিক রেখে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতি সাধন না করে শিল্পনগরী শিল্পপার্ক গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। বিসিকের প্রক্রিয়াধীন এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পসমূহে শতকরা ৬০ ভাগ জায়গা শিল্প প্লট হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং অবশিষ্ট জায়গা বৃক্ষরোপণ, পুকুর, লেক, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদির জন্য ব্যবহার করা হবে। মনোটাইপ ব্যতীত নতুনভাবে স্থাপিত শিল্পনগরীসমূহে শিল্প কারখানার উদ্যোক্তাদের লে-আউট প্ল্যানে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপনের প্রয়োজনীয় জায়গা রেখে লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
● দেশে সবুজ শিল্পায়নের লক্ষ্যে বিসিক ২০৪১ সাল নাগাদ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে ১০টি পরিবেশবান্ধব শিল্পপার্ক স্থাপনে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মধ্য মেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে সারাদেশে ৪০টি পরিবেশবান্ধব শিল্পপার্ক স্থাপনের মাধ্যমে আনুমানিক ১ কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বিসিক সারাদেশে পরিবেশবান্ধব ১০০টি শিল্পপার্ক স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করছে যার মাধ্যমে আনুমানিক ২ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সবুজ শিল্পায়নের পাশাপাশি দেশব্যাপী শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাগণ শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত হবেন।
● বিসিআইসি সরকারি সংস্থা বিধায় সরকারের সমস্ত আইন ও বিধি-বিধান অনুসরণপূর্বক প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। দেশে সবুজ শিল্পায়নে বিসিআইসি ইতোমধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি, জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ করেছে। নরসিংদী জেলায় পনের হাজার ৫০০ কোটি ২১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে বার্ষিক ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে চলছে। এই প্রকল্প থেকে নির্গত পরিবেশ দূষক কার্বন- ডাই-অক্সাইড (সিওটু) ক্যাপচার করে সিওটু ব্যবহার করে ইউরিয়া সারের উৎপাদন (প্রায় ১০ শতাংশ) বৃদ্ধি করা হবে। এর ফলে ইউরিয়া সারের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সিওটু নিঃসরণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের ফলে পরিবেশ রোধে কারখানাটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
● বিসিআইসি নিয়ন্ত্রণাধীন কারখানাসমূহে এবং বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) রয়েছে। কারখানাসমূহের তরল বর্জ্য এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে ফিজিক্যাল এবং কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করার পর টিউট্রালাইজড বর্জ্য নির্গমন করা হয়। প্রতিটি কারখানায় মানসম্মত পরীক্ষাগার রয়েছে যেখানে তরল বর্জ্যের নিয়মিত বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিশ্লেষণকৃত প্যারামিটারসমূহের মানমাত্রা পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে রেখে বর্জ্য নির্গমন করা হয়।
● আগামী প্রজন্ম ও জাতির স্বার্থে দেশে সবুজ শিল্পায়ন গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিবেশ সংরক্ষণপূর্বক শিল্পায়নের উদ্দেশ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন পরিবেশ দূষণরোধে শিল্প বর্জ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে “১৪টি চিনিকলে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনা” শীর্ষক একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার বাস্তবায়ন কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়া “কেরুজ ডিস্টিলারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক অনুজীব ল্যাবরেটরি স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা” শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
● শিল্প সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে দেশে সবুজ প্রযুক্তি গড়তে বিএসটিআই কর্তৃক জ্বালানি সাশ্রয়ী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি করতে সোলার যন্ত্রাংশের মান প্রণয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ভেহিকল ব্যাটারির মান প্রণয়ন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এসি, রেফ্রিজারেটর, ফ্যানের মান প্রণয়ন এবং উক্ত মান অনুসারে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এসি, রেফ্রিজারেটর, ফ্যান উৎপাদিত ও বাজারজাত হচ্ছে এবং প্যাকেজিংয়ের জন্য বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগের মান প্রণয়ন করা হয়েছে।












