কোনো দম্পতি এক বছর বা এর অধিক সময় জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করে নিয়মিত মেলামেশা করেও গর্ভধারণে ব্যর্থ হলে তাকে বন্ধ্যাত্ব বলে। প্রতি ১০০টি দম্পতির মধ্যে ৮টি দম্পতি বন্ধ্যাত্বের শিকার হয়ে থাকেন। বর্তমানে নারীদের দেরিতে বিয়ে করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্ধ্যাত্বও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেননা নারীদের ক্ষেত্রে ৩০ বছর বয়সের পর থেকে যেমন ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে থাকে তেমনি পুরুষের ক্ষেত্রে ৪০ বছর বয়সের পর থেকে শুক্রাণু উৎপাদন কমতে থাকে। বন্ধ্যাত্বের জন্য ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রে নারীর সমস্যা, ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রে পুরুষের সমস্যা আর বাকি ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে দুজনের সমস্যা দায়ী। কিন্তু ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে সমস্যা অজানা থেকে যায়।
নারীর বন্ধ্যাত্বের কারণ
১. অনিয়মিত ডিম্বস্ফোটন বা ডিম্বস্ফোটন না হওয়া – যা পিসিওএস বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম রোগে বেশি হয়।
২. ওভারির রিজার্ভ কমে যাওয়া বা ডিমিনিশড ওভারিয়ান রিজার্ভ – নারীদের ক্ষেত্রে ৩০ বছর বয়সের পর তার ডিমের সংখ্যা বা ওভারিয়ান রিজার্ভ কমতে থাকে। অনেকের অল্প বয়সেই ডিমের রিজার্ভ কমে যায়। পরিবেশদূষণ, হরমোন অটোএন্টিবডি রিজার্ভ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
৩. এন্ডোমেট্রিয়োসিস – এই রোগ বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণের মধ্যে একটি। এতে জরায়ুর অভ্যন্তরীণ স্তর ডিম্বাশয়সহ জরায়ুর বাইরে অন্যান্য স্থানে অবস্থান করে।
৪. পিআইডি বা প্রজননতন্ত্রে ইনফেকশন – সাধারণত সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ইনফেকশনের কারণে হয়ে থাকে।
৫. হরমোনজনিত সমস্যা – থাইরয়েড, প্রল্যাকটিন অথবা পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যা ইত্যাদি।
৬. ফ্যালোপিয়ান টিউব বা ডিম্বনালীতে ত্রুটি বা ডিম্বনালী বন্ধ থাকা।
৭. জরায়ুতে টিউমার বা জন্মগত ত্রুটির কারণেও বন্ধ্যাত্ব হয়ে থাকে।
পুরুষের বন্ধ্যাত্বের কারণ
১. অন্ডকোষে শুক্রাণু বহনকারী টিউবে বাধা বা বন্ধ থাকা
২. প্রজননতন্ত্রের ইনফেকশন
৩. বীর্য তৈরি না হওয়া
৪. বীর্যপাত না করতে পারা
৫. বিভিন্ন হরমোনজনিত সমস্যার কারণে বীর্য পরিমাণে কম হয় কখনো কখনো। অস্বাভাবিক গঠনের বীর্য বেশি থাকে। অনেক সময় বীর্যরসে কোনো বীর্যই থাকে না।
৬. নারীর মতো পুরুষেরও বীর্যের গুণগতমান ও সংখ্যা ৪০ বছর বয়স থেকে কমতে থাকে। তাই এরপর বন্ধ্যাত্ব যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশু জন্মের আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
কোনো দম্পতির একটি বিস্তারিত মেডিক্যাল ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করার জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের বিভিন্ন ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয় করা যায়। নারীদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলো হলো অনিয়মিত মাসিক, মাসিকে অতিরিক্ত ব্যথা, শারীরিক মিলনে ব্যথা, ওজন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, শরীরে অস্বাভাবিক লোম হওয়া ইত্যাদি।
চিকিৎসা
প্রথমেই শরীরের অস্বাভাবিক কম বা বেশি ওজন স্বাভাবিকের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। চিকিৎসার মাধ্যমে হরমোনজনিত সমস্যার সমাধান করতে হবে। সাধারণত বন্ধ্যাত্ব রোগের চিকিৎসায় নিম্নের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা হয়:
১. অভ্যুলেশন ইনডাকশন: ডিম্বাণু বড় করার ও ডিম্বস্ফোটনের ওষুধ মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশন এর মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়।
২. আইইউআই: এই পদ্ধতিতে সিমেন ওয়াশ করে একটিভ স্পার্ম আলাদা করে ক্যাথেটারের সাহায্যে সরাসরি স্ত্রীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। পুরুষের বীর্যজনিত সমস্যা এবং স্ত্রীর জরায়ুমুখের সমস্যাজনিত বন্ধ্যাত্বের সমাধানে এটি কার্যকর পদ্ধতি।
৩. ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ): এক্ষেত্রে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে ফার্টিলাইজেশনের মাধ্যমে জাইগোট তৈরি করে জরায়ুর ভেতর স্থাপন করা হয়।
বর্তমানে আমাদের লাইফস্টাইল ও পরিবেশ দূষণসহ নানাবিধ কারণে বন্ধ্যাত্ব রোগের হার ক্রমে বেড়ে চলেছে। এর চিকিৎসাও এখন অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। তবে মনে রাখতে হবে, বন্ধ্যাত্ব কোনো অভিশাপ নয়। বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয় করে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (গাইনি), চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ
সূত্রঃ ইনডিপেনডেন্ট টিভি।












