ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
ঝালকাঠিতে জেলা প্রশাসক হিসেবে ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যোগ দেন ২৪তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আশরাফুর রহমান, যিনি বর্তমানে যুগ্ম সচিব।
দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মানবিক উদ্যোগ এবং জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন। বালু সিন্ডিকেট ভেঙে নদীভাঙন রোধ, প্রতি বুধবার গণশুনানির মাধ্যমে জনগণের অভিযোগ শোনা, শহীদ পরিবারের পাশে থাকা এবং বিশেষ শিশুদের জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করায় তিনি জেলাবাসীর কাছে প্রশংসিত হচ্ছেন।
অতীতে ঝালকাঠিতে অনেক জেলা প্রশাসক এসেছেন এবং বদলিজনিত কারণে চলে গেছেন। কেউ প্রশাসনিক কাজে সুনাম অর্জন করেছেন, আবার কেউ মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এদের মধ্যে শাখাওয়াত হোসেন, রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া ও হামিদুল হকের নাম আজও মানুষের মনে গেঁথে আছে। বর্তমান জেলা প্রশাসক আশরাফুর রহমানও তাদের মতোই প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তার দায়িত্ব নেয়ার পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন ধরে সুগন্ধা ও বিষখালী নদী থেকে বালু সিন্ডিকেটরা প্রভাব বিস্তার করলেও আশরাফুর রহমানের কঠোর অবস্থানের কারণে এ অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। সিন্ডিকেটরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে ‘ম্যানেজ’ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ একটি বড় সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে।
নিয়মিত গণশুনানির মাধ্যমেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তিনি। প্রতি বুধবার নির্ধারিত সময়ে তিনি নিজেই উপস্থিত থেকে সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা শোনেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধান করেন। সরকারি ব্যস্ততা বা অন্য কোন অনুষ্ঠান থাকলেও এদিন তিনি গণশুনানি মিস করেন না। জনসেবার এ আন্তরিকতা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করেছে।
অবৈধ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে পৌর প্রশাসককে নির্দেশ দিয়ে তিনি শহরের ভোগান্তি কমিয়েছেন। পাশাপাশি জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের কবর জিয়ারত করেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক তাদের পাশে থাকবে। এমনকি রোজার ঈদে শহীদ পরিবারের হাতে উপহারও পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। এতে শহীদ পরিবারগুলো তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
বিশেষ শিশুদের কল্যাণেও কাজ করেছেন তিনি। ঝালকাঠি সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের জন্য রুম, টয়লেট ও টিফিনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ক্লাস করার জন্য শেড নির্মাণের উদ্যোগ নেন। শিশুদের সাথে সময় কাটান এবং আর্থিক সহায়তাও দেন। বিদ্যালয়ে গেলে বিশেষ শিশুরা তাকে পেয়ে আনন্দিত হয়ে তার সাথে ছবি তুলতে চায়—এমন দৃশ্যও দেখা যায়।
এছাড়া সাংবাদিকদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন তিনি। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় চোখ রাখেন এবং কোন সমস্যা তার নজরে এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেন। প্রয়াত প্রেসক্লাব সভাপতি কাজী খলিলুর রহমানের মৃত্যুতে তিনি জানাযায় অংশ নিয়েছেন ও প্রেসক্লাবে গিয়ে শোক প্রকাশ করেন এবং স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হন। তাছাড়া কাজী খলিল অসুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, জেলা প্রশাসক আশরাফুর রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর ঝালকাঠিতে একের পর এক প্রশাসনিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছেন। ফেসবুকে ধর্মীয় কটূক্তি ঘটনার পর পুলিশ-সেনা মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ-আহতদের আর্থিক সহায়তা প্রদান, “তারুণ্যের উৎসব ২০২৫” এ ১৩৩টি ইভেন্ট আয়োজন, কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রেরণ, রমজানে ‘প্রশান্তি’ বিক্রয় কেন্দ্র চালু, টিসিবি কার্ড যাচাই, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে দেশসেরা হওয়া, কাবিখা-কাবিটা ও টিআর প্রকল্প বাস্তবায়ন, নকলমুক্ত এসএসসি পরীক্ষা আয়োজন, শারদীয় দুর্গাপূজায় বিশেষ নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স গঠন, কৃষকের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যের বাজার চালু, পলিথিন ব্যবহার রোধ, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফল, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন, হাসপাতালের সমস্যার সমাধান এবং ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ—সবকিছুতেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
এতসব কর্মকাণ্ড মিলিয়ে জেলাবাসীর কাছে আশরাফুর রহমান কেবল একজন প্রশাসক নন, বরং একজন জনবান্ধব অভিভাবক হিসেবে পরিচিত হয়েছেন।










