*মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ শেষ * রং তুলির আচড়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেবীর আসল রূপ
বরিশাল প্রতিনিধিঃ
বাংলার প্রকৃতিতে এখন চলছে শরৎ কাল। চারদিকে মৃদুমন্দ হাওয়ার দোলা লেগেছে কাশবনে। ঢলে পড়ছে এ ওর গায়ে। প্রাতস্নাতা শিউলি তার জাফরানি বোঁটার দুধসাদা ছয় পাপড়ির গন্ধ নিয়ে জানান দিচ্ছে শারদ আসছে। এদিকে শরতকে শারদীয় রঙে রাঙাতে শারদের আমন্ত্রণের বার্তাতেই রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী দুর্গার আবাহনের হাতছানি।
আগামী ২০ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে পাঁচদিনব্যাপী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হতে যাচ্ছে। গোটা দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে চলছে পূজার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে পুরোদমে। প্রতিমা নির্মাণের জন্য শেষ সময়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন প্রতিমা শিল্পীরা। এ সময়ে দম নেয়ার ফুরসত নেই প্রতিমা শিল্পীদের। প্রতিটি মন্দিরে প্রতিমার অবকাঠামোর উপরে মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এখন রং তুলির আচড় এবং অলংকরণ করে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেবীর সৌন্দর্য্য। অনেকেই দেবী দুর্গার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। ইতিমধ্যে বিভাগের অধিকাংশ মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ সমাপ্তও হয়েছে। অনেকে একটু এগিয়ে মÐপ ও মন্দির-আঙিনা সাজসজ্জার কাজ করছেন।
বরিশালে প্রতিমা তৈরির কারিগর সাগর পাল বলেন, এবার আমি ১২টি প্রতিমা তৈরি করেছি। এতে খরচ বাদে আমার প্রায় ২ লাখ টাকা আয় হবে।
ঝালকাঠির মদন পাল বলেন, ‘প্রতিমা তৈরি আমাদের পৈত্রিক ব্যবসা। তাই এই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য আমরা কাজ করছি। তবে আগের তুলনায় মজুরী কমে গেছে এখন। আর পেশার কদর না থাকায় অনেকেই পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য বলছে এবার বরিশাল বিভাগে ছোট বড় মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৭৬৬ মÐপে দূর্গা পূজার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
সূত্রমতে, বরিশাল জেলায় এ বছর মোট ৬০০ মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। তার মধ্যে বরিশাল মহানগরীতে ৪৫টি পূজামÐপ রয়েছে। বরগুনা জেলায় ১৬১টি মÐপ নির্মাণ হচ্ছে। এর মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলায় ৩১, পাথরঘাটা ৫০, আমতলী ১৪, বামনা ১৭, বেতাগীতে ৩৭ এবং তালতলী উপজেলায় ১২ টি পূজা মÐপে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। ঝালকাঠিতে ১৬৮ মÐপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ৭২, রাজাপুর ২২, নলছিটি ২২ এবং কাঠালিয়া উপজেলায় ৫২টি মÐপ হবার কথা রয়েছে। এছাড়াও পিরোজপুর জেলার ৭টি উপজেলায় মোট ৫৩৬ টি মÐপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। দ্বীপ জেলা ভোলায় ১১৬টি ও পটুয়াখালী জেলায় মোট ১৮৫টি মÐপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানাগেছে।
ইতোমধ্যে মÐপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্দির কমিটি ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্গাপূজা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশের সদস্যরা নিরলস দায়িত্ব পালন করবেন। সেই সঙ্গে সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা বিশেষ ডিউটিতে থাকবেন। প্রতিটি মÐপে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত সংখ্যাক সদস্য মোতায়েত থাকবে। পূজা উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা থাকবে মÐপগুলো।
উপ-মহাদেশের সর্ববৃহৎ দুর্গা মন্দির বরিশালে \ প্রয়াত জমিদার মোহন লাল সাহার বাড়িতে মহাধুমধামের মধ্যদিয়ে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ভক্তদের পদচারনায় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। সিংহ মুর্তি খচিত জমিদার বাড়ির এ মন্দিরটি প্রায় ১৭২ বছরের পুরনো ও তৎকালীন ভারতীয় উপ-মহাদেশের সর্ববৃহৎ দুর্গা মন্দির। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার আশোকাঠী গ্রামের জমিদার বাড়ির সামনে অবস্থিত এ দুর্গা মন্দিরটি এ অঞ্চলের মধ্যে সর্ববৃহৎ হওয়ায় প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মহাধুমধামের সাথে এখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে সকল ধরনের প্রস্তুতি।
জমিদার বাড়ির উত্তরসূরীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, ১৮৫০ সালে খ্যাতিমান জমিদার মোহন লাল সাহার বাবা জমিদার প্রসন্ন কুমার সাহার উদ্যোগে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। কারুকার্জ খচিত ঐতিহাসিক এ মন্দিরের ছাঁদের ওপরের চারিপার্শ্বের সিংহ মূর্তিগুলো আজো যেন কালের স্বাক্ষী হয়ে রয়েছে। সূত্রমতে, তৎকালীন সময়ে ভারতীয় উপ-মহাদেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ মন্দির হিসেবে এ মন্দিরটিতে ভক্ত দর্শনার্থীরা পূজা অর্চনা করতে ভীড় করতেন। প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার দুর্গা প্রতিমার এ মন্দিরটিতে এখনো পূর্বের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। ৩০ গজ দৈর্ঘ্য, ২০ গজ প্রস্থ মন্দিরটিতে রয়েছে নকশা করা ৪৫টি স্তম্ভ।
জমিদার মোহল লাল সাহার নাতী প্রভাষক রাজা রাম সাহা জানান, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার ও তাদের স্থানীয় সহযোগি রাজাকাররা তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট করেছিলো। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলো পাইক পেয়াদাদের ঘরবাড়ি। গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো দুর্গা মন্দিরের অসংখ্য কারুকার্জ খচিত অলংকরণ।
স্থানীয়রা জানান, একসময় জমিদার বাড়িতে এ অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের জন্য প্রায় বারো মাস যাত্রা, জারি, সারী ও পালা গানের আয়োজন করা হতো। হাজার-হাজার মানুষের পদচারনায় মুখরিত ছিলো এ বাড়িটি। পুরনো দিনের সেই জৌলুস এখন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
এবারও আকর্ষণ থাকবে মঠবাড়িয়ার রাজমন্দিরে \ বেদ, মহাভারত, শ্রীমদভগবদগীতা ও পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে ৪৫০ টি প্রতিমা নিয়ে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বড় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার কবুতরখালীর রাজমন্দিরে। প্রতিবার এখানে ব্যতিক্রমী নানা আয়োজন করা হয়। তাই এবারও দৃষ্টি সবার এইদিকে। এখানে ইতোমধ্যে প্রতিমা তৈরিসহ সব প্রস্তুতি শেষ হয়ে আসছে। গতবছর এখানে ২৫১ টি প্রতিমা দিয়ে দুর্গাপূজা করা হয়েছে।
আয়োজকরা জানান, মন্দিরের অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবার দুর্গোৎসবে ৪৫০ টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। এবারের আয়োজনে বিগত বছরের সঙ্গে নতুন অনেক কিছুই যুক্ত হচ্ছে।
আয়োজক কমিটি আরো জানান, বিগত বছরগুলোর মতো এবারেও দুর্গাপূজা যে কয়দিন চলবে প্রতিদিন কয়েক হাজার লোকের জন্য প্রসাদের ব্যবস্থা রাখা হবে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের জন্য খাবারের পাশাপাশি থাকার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে। অসহায়, দুস্থ নারীদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ এবং দরিদ্র-মেধাবী ও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতাকে মন্দিরের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
সূত্রমতে, এবারের পূজায় নতুন প্রজন্মের জন্য কবুতরখালীর ডাক্তার বাড়ি ও রাজমন্দির প্রাঙ্গণে অনেক কিছু সংযোজন করা হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালের পাশাপাশি তাকে (বঙ্গবন্ধু) নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই, তথ্য ও চিত্র নিয়ে বঙ্গবন্ধু কর্নার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা বইয়ের সংযোজন ঘটিয়ে শেখ হাসিনা কর্নার, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য-চিত্র নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার এবং শেখ রাসেল কর্নার করা হবে।










