জনতার খবর ডেস্কঃ বিচার শেষ হওয়ার আগেই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা মামলার দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের মৃত মুরাদ আলী’র ছেলে আবদুল মোকিম (৬০) ও মৃত আকছেদ সর্দার-এর ছেলে গোলাম রসুল ঝড়ু (৬২) ফাঁসি কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ। ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর রাতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। অথচ গতকাল ৩ নভেম্বর বুধবার ছিলো তাদের আপিল শুনানির দিন।
বিচারাধীন আপিল নিষ্পত্তির আগে আসামিদের এভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে নজিরবিহীন হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিচারসংশ্লিষ্টরা। বিচারিক আদালত যদি কারও মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন, তার পরে ফাঁসি কার্যকরের আগে অন্তত চারটি ধাপ থাকে। প্রথমে হাইকোর্টে যায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য। সেখানেও রায় বহাল থাকলে আপিল বিভাগে রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করা যায়। এতেও নাকচ হলে রিভিউ বা রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যায়। তাতেও রায় না পাল্টালে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বিচারের এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে আপিল শুনানির তারিখের দিন জানা গেলো, চার বছর আগেই দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেছে।
নিহত মনোয়ার হোসেনের ছেলে এমন ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন-বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ওই সময়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের দায়িত্বরত জেলার তুহিন কান্তি খান-এর সংগে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৪-এর ২৮ জুন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামে চরমপন্থি ক্যাডারদের হাতে খুন হন মুক্তিযোদ্ধা ও তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মনোয়ার হোসেন। তিনি স্থানীয় কুমারী ইউনিয়ন পরিষদের দুই মেয়াদে সদস্য ও কৃতী খেলোয়াড় ছিলেন। খুনের ঘটনায় তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা অহিম উদ্দীন বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় ২১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলা দায়েরের এক যুগের বেশি সময় পর ২০০৮-এর ১৭ এপ্রিল তিনজনের মৃত্যুদণ্ড, দু’জনকে যাবজ্জীবন ও অপর আসামিদের খালাস দেন চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত।
মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তরা হলেন- একই ইউনিয়নের তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, আবদুল মোকিম ও গোলাম রসুল ঝড়ু। বিচারিক আদালতের রায়ের পর নিয়ম অনুসারে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য মামলাটি ‘ডেথরেফারেন্স’ (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের মামলা) হিসেবে হাইকোর্টে আসে। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট মোকিম ও ঝড়ুর মৃত্যুদণ্ডা দেশ বহাল রেখে ২০১৩-এর ৭ জুলাই ও ৮ জুলাই রায় ঘোষণা করেন। বাকি আসামিদের খালাস দেন। পরে মোকিম (আপিল নং-১১১/২০১৩) ও ঝড়ু (আপিল নং-১০৭//২০১৩) সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন। আপিল শুনানি নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই ২০১৭-এর ১৬ নভেম্বর রাতে এই দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারিক আদালতে কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এই দুই আসামির ক্ষেত্রে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দেওয়ার পর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আপিল করায় স্বাভাবিক নিয়মেই তাদের ফাঁসি কার্যকরের আদেশ স্থগিত হয়ে যাবে। আপিল নিষ্পত্তির পরও সাজা বহাল থাকলে আসামিরা রিভিউ আবেদন করতে পারবেন একই আদালতের কাছে। এমনকী রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনও করতে পারবেন- এটিই হলো আইন ও সাংবিধানিক বিধান। কিন্তু বিচারের দু’টি ধাপ ও একটি প্রশাসনিক ধাপ বাকি থাকার পরও দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা আইনের শাসনের ব্যর্থতা, মানবাধিকারের লঙ্ঘন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এই ঘটনাকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য ও হৃদয়বিদারক বলে দাবি করছেন বিচারসংশ্লিষ্টরা।
সূত্রঃ বাংলা ভিশন।












