ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে নলছিটি উপজেলার মল্লিকপুর এলাকার সেলিম তালুকদার (২৮) ১৮জুলাই আন্দোলনে থাকা অবস্থায় ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গুলিবিদ্ধ হলে ১৪ দিন পপুলার হাসপাতালের আইসিউতে থাকা অবস্থায় ৩১ জুলাই রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১ আগস্ট সকালে চিকিৎসকের দেয়া মৃত্যু সনদ নিয়ে নলছিটিতে পৌছাতে রাত হলে ২আগস্ট সকালে তার নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। বছর খানেক আগে বিয়ে হওয়ায় স্বামীহারা শোকে বাকরুদ্ধ ২মাসের অন্তসত্তা স্ত্রী সুমী আক্তার। তার দাবী হত্যাকান্ডের ন্যায় বিচার ও সরকার কর্তৃক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
নিহত সেলিমের শোকার্ত স্ত্রী সুমী আক্তার দুঃখভারাক্রান্ত অবস্থায় জানান, গত ১৮ জুলাই মধ্য বাড্ডা লিংক রোডের কুমিল্লাপাড়ার বাসা থেকে সকালে নারায়ণগঞ্জে তার অফিসের কথা বলে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দেন সেলিম। তাকে ফোন দিলে তখন বুঝতে পারি সে আন্দোলনে তখন বাসায় আসতে বললে বলে আসতেছি একটু পরে। সে আসা আর হলো না সেলিমের। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংঘর্ষের মধ্যে আটকে পড়েন তিনি। এ সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গুলিবিদ্ধ হন। তখনই অজানা কারণে আমার (স্ত্রী সুমী) বুকটা ভার হয়ে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। কে বা কারা প্রথমে মুগদা হাসপাতালে নেন তাকে।
সেখান থেকে সেলিমের মোবাইলে থাকা শ্বাশুরীর (তার মা) মোবাইল নম্বরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফোন দেন অজ্ঞাত এক ব্যক্তি। ফোনে খবর পেয়েই তারা ওই হাসপাতালে ছুটে যান। তার মাথা, বুক ও পিঠে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। রোগীর অবস্থা খারাপ দেখে আমরা বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেও আইসিইউ খালি পাননি। একই সঙ্গে প্রশাসনিক হয়রানির ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী ভর্তি নিতেও অস্বীকৃতি জানান। অসহায় অবস্থায় ঘুরে ঘুরে হাসপাতাল খুজতে খুজতে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হয় সেলিমকে। ৩১ জুলাই রাতে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। স্বামীর ১৪ দিন মৃত্যু যন্ত্রণা খুব কাছ থেকেই দেখেছি তখন টের পেলাম বুকের ওজনটা হঠাৎ কমে আমার বুকটা খালি হয়ে গেলো। ১আগস্ট সকালে চিকিৎসক তার মৃত্যু সনদ দেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুমী আরও জানান, প্রায় এক বছর আগে বিয়ে আমাদের। বিজিএমই ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে সদ্য স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে নারায়ণগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সহকারী মার্চেন্ডাইজার পদে চাকরি শুরু করেন। তারা তিন বোন, এক ভাই। সেলিম ছিলেন মেজো।
হতাশা প্রকাশ করে সেলিমের স্ত্রী সুমী জানান, পুলিশ যেভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করেছে সেটা মনে হচ্ছে পরিকল্পিত। আমি আমার স্বামী হত্যা কান্ডের সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায় বিচার চাই। আমি আমার স্বামীকে ভুলতে পারছি না। দাবী করে সুমী জানান, মারা যাবার পরে শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করলে ৫আগস্ট নলছিটির একটি প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ডাক্তার দেখিয়ে আলট্রাসনোগ্রাম করলে তখন ৪সপ্তাহ ৬দিনের অন্তসত্তার বিষয়টি ধরা পড়ে। অনাগত সন্তানের বয়স (গর্ভে) বর্তমানে ২মাস। সরকারীভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিলে সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন হতো। তাই সরকারের কাছে কর্মসংস্থান পেতে আকুতি ও দাবী জানান নিহত সেলিমের স্ত্রী সুমী।
নিহত সেলিমের ছোট বোন সোমা এ ঘটনা নিশ্চিত করে জানান, আমরা যা হারানোর তা হারিয়েছি। তবে অনাগত সন্তান তার পিতাকে চিনতে পারলো না, পিতার আদোর থেকেও বঞ্চিত হলো। আমরা কি জবাব দিবো তাকে এর উত্তর হয়তো আমাদের কাছে থাকবে না। যখন জিজ্ঞেস করবে আমার বাবা কোথায়?
প্রসঙ্গত, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ১২ ঘণ্টা পর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ১৪দিন আইসিইউতে থেকে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সেলিম তালুকদার (৩০)। সেলিম ঝালকাঠির নলছিটি পৌরসভার মল্লিকপুর গ্রামের মো. সুলতান হোসেন তালুকদারের ছেলে।
নিহত সেলিম তালুকদারের মা সেলিনা বেগম জানান, ‘দীর্ঘদিন আমার ছেলেটা আইসিইউতে ছিল। সেখানে অনেক কষ্ট পেয়েছে, চোখে না দেখলে বোঝানো যাবে না। যদি সে দিন গুলি লাগার পর সেখানেই মারা যেতো, তাহলে হয়তো এতো কষ্ট পেতো না। আমি চাই না আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক। সেদিন সকালে আমার ছেলে বাসা থেকে বের হয়েছিল। সেই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া হয়ে গেল।’
মো. সুলতান হোসেন তালুকদার জানান, এখন আমাদের আর কিছু করার নাই, কি করবো তাও নিজেরা ভেবে পাচ্ছি না। কিভাবে চলবো, কিভাবে থাকবো, কিভাবে কি করবো? আমাদের এই ছেলে হারানোর শোকেই অস্থির। জবান থেকে বের হবে এমনও কোন কথা বলার নাই।










