নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল ॥
বরিশাল মহানগর ঘিরে থাকা ১০ টি ইউনিয়ন সদর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও নগর রাজনীতিতে এই ইউনিয়নের দলের নেতাকর্মীদের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ১০ ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৮টিতে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। এ বছর অনুষ্ঠিত ১০ ইউনিয়নের নির্বাচনে ৫ টিতেই পরাজিত হয়েছেন নৌকার প্রার্থী। অপরদিকে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আগের মতোই দুটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হলেও ভোটপ্রাপ্তিতে বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে দলটির। বৃহস্পতিবার ছয় ইউনিয়নের নির্বাচনে নৌকার প্রায় সমান ভোট পেয়েছে ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীক।
সদর উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত ফলে দেখা গেছে, ছয় ইউনিয়নে নৌকার প্রাপ্ত মোট ভোট ২৮ হাজার ৮৫৩ এবং হাতপাখা প্রতীকের ২৮ হাজার ৩৫২। অর্থাৎ নৌকার চেয়ে ৫০১ ভোট কম পেয়েছে হাতপাখা। স্বতন্ত্রের আড়ালে দলীয় ছায়াপ্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে বিএনপি ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকার পরও হাতপাখার প্রাপ্ত ভোট বিস্ময়কর। তারা চারটি ইউনিয়নেই বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থানে পৌঁছেন। বিশেষ করে পীর পরিবারের নিজ ইউনিয়ন চরমোনাইয়ে হাতপাখা ঠেকাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির প্রকাশ্যে ঐক্য হীতে বিপরীত হয়েছে। সেখানে বিগত বছরগুলোর চেয়ে দ্বিগুণ বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী পীরের ভাই মুফতি সৈয়দ মো. জিয়াউল করীম। ২০০২ সাল থেকে টানা চার মেয়াদ এ ইউনিয়নে পীর পরিবারের সদস্যরা জয়ী হলেন।
দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে বৃহস্পতিবার সদর উপজেলায় ৬ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তার মধ্যে রায়পাশা-কড়াপুর, চরকাউয়া ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। অপর ৩টির মধ্যে চরমোনাইয়ে হাতপাখা, চাঁদপুরায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র এবং চন্দ্রমোহনে বিএনপি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হন। এর আগে গত ২১ জুন সদরের চারটি ইউপি নির্বাচনে কাশীপুর ও চরবাড়িয়ায় নৌকা এবং টুঙ্গিবাড়িয়ায় স্বতন্ত্র ও জাগুয়ায় হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন।
প্রাপ্তভোটে দেখা গেছে, রায়পাশা-কড়াপুরে ৩৩২ ভোট, চন্দ্রমোহনে ৫২৮ ভোট এবং চাঁদপুরায় ১ হাজার ৪১০ ভোট কম পেয়ে হাতপাখার প্রার্থী বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন। অপরদিকে বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে চাঁদপুরায় ১ হাজার ৫৪৮ ও চন্দ্রমোহনে ৫৯৮ ভোট কম পেয়ে নৌকার প্রার্থীর অবস্থান হয় তৃতীয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে বড় ব্যবধান জয়ী হতে পেরেছেন শুধু চরকাউয়াতে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনিরুল ইসলাম ছবি। তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাতপাখার প্রার্থীর চেয়ে ১ হাজার ৭৩৮ ভোট বেশি পেয়েছেন।
সদরের ১০ ইউনিয়নের মধ্যে ৫টিতে নৌকার প্রার্থীর পরাজয় প্রসঙ্গে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হালিম রেজা মোফাজ্জেল বলেন, আমাদের মধ্যে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকতে পারে। একমাত্র চন্দ্রমোহন ছাড়া সবগুলো ইউনিয়নে দলের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। এটাও নৌকার পরাজয়ের অন্যতম কারণ। হাতপাখার বিস্ময়কর ভোটপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে এ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মভীরু, হুজুর আসল নাকি নকল সেটা যাচাই-বাছাই করেন না বেশিরভাগ ভোটার।
ইসলামী আন্দোলনের জেলা সেক্রেটারি উপাধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতি বিমুখ হয়ে ইসলামী আন্দোলনকে দেশের তৃতীয় শক্তি ভাবছে। তাই হাতপাখার ভোটপ্রাপ্তি প্রতি বছরই বাড়ছে। বিএনপি ভোটের মাঠে না থাকায় ওই ভোট হাতপাখা পাচ্ছে- এমন যুক্তি নাকচ করে দিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, বরিশাল সদরের চরমোনাইয়ে বিএনপি প্রকাশ্যে নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে ভোট চেয়েছে। ৩টি ইউনিয়নে বিএনপির ছায়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিল। অপর দুটি ইউনিয়নে তারা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে ছিলেন। এসব হিসাব-নিকাশে বিএনপি সমর্থকদের ভোট হাতপাখা প্রতীক পায়নি।
এদিকে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে সদরের ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল চরমোনাই। এখানে পীর পরিবার হটাতে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক চেয়ারম্যান সালাম রাঢ়ী প্রকাশ্যে নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে ভোট চান। আওয়ামী লীগ-বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় চরমোনাইয়ে নির্বাচন ছিল তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত নৌকার প্রার্থী নুরুল ইসলামের চেয়ে ৩ হাজার ৪৯৪ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন পীরের ছোট ভাই সৈয়দ মো. জিয়াউল করীম।










