কাঠালিয়া প্রতিনিধিঃ
ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলায় দক্ষিন শৌলজালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ভারপ্রাপ্ত কাঠালিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার চিরকুমার মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে ছালে মিয়া (৬৫) দীর্ঘদিন ধরে আলো বাতাসহীন জড়াজীর্ন বিদ্যুৎবিহীন ঘরে বসবাস করছে। এলাকায় তিনি সকলের কাছে সাদা মনের মানুষ হিসাবে পরিচিত। তার ঘরে বিদ্যুৎ নেই। দিনের বেলাও অন্ধকার ঘরে মশারি টানিয়ে বিশ্রাম করতে হয়। জড়াজীর্ন ঘরে নেই কোন জানালা। এক কক্ষের ঘরটিতে প্রবেশের জন্য একটি মাত্র দরজা রয়েছে। মোয়াজ্জেম হোসেন সবসময় সত্যের পথে কোথাও কোন অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করেন।
শৌলজালিয়া গ্রামের মনু মিঞার সন্তান মোয়াজ্জেম হোসেন। বরগুনায় লেখাপড়া কালীন সময় ১৯৭১ সালে মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে ছালে মিয়া মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। ভারতে প্রশিক্ষন নিয়ে সাব সেক্টর কমান্ডার মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে রনাঙ্গনে যুদ্ধ করেন।
ঘর না পাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আমি উপজেলা কমান্ডার। এ উপজেলায় ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে যাদের গৃহ নির্মান প্রয়োজন। তাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনের নামে ঘর বরাদ্দ হয়েছে। উপজেলার এ সকল শ্রেণিভূক্ত মুক্তিযোদ্ধার ঘর নির্মানের পরেই আমি ঘর চাইতে পারি, তার পূর্বে ঘরের জন্য নাম দেওয়া হলে তাহা নীতি বর্হিভূত হবে ও মুক্তিযোদ্ধা নেতা হিসাবে এটা আমার জন্য সমুচিত নয়।
অপরদিকে ৩০ বছর পূর্বে একই এলাকার এক অসহায় নারী সাফিয়া বেগম (৬০) কে তার ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। দুজনেই একই ঘরে ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়ে বসবাস করছে এই দীর্ঘ সময়। সাফিয়া বেগমের একরকমের মানসিক প্রতিবন্দ্বিতা রয়েছে। সে স্বাভাবিক সত্তায় থাকলে অত্যান্ত চমৎকার মানুষ কিন্তু কোন কারনে ক্ষুব্ধ হলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে থাকেন। তার গালাগালি না খেয়েছে এমন কোন এলাকার মানুষ নেই। মানুষের বিপদ দেখলে সাফিয়া বেগম ছুটে আসেন কিন্তু এই মহিলার ভাগ্যে এখন পর্যন্ত জোটেনি কোন বয়স্ক, প্রতিবন্ধি ও স্বামী পরিত্যাক্তা ভাতা। সাফিয়া সখের বসে ৬/৭ টি ছাগল লালন পালন করে।
সাফিয়া বেগমের কিশোরী বয়সে বিয়ে হয় কিন্তু তার মানসিক প্রতিবন্দ্বিতাজনিত কারনে বিয়ের ৩ দিন পর স্বামী তাকে পিত্রালয় পাঠিয়ে দেন। তারপর থেকে সাফিয়া বেগমের ভাগ্যে আর কোন বর জুটেনি। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর তার পরিবারের সাথে সম্পর্কের বাধন আলগা হতে থাকে। এক পর্যায় পিত্রালয় ছাড়া হয়ে পথে পথে সাফিয়া বেগমকে ঘুরে বেড়াতে হয়। ৩০ বছর পূর্বে মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন তাকে তার ঘরে আশ্রয় দেয়। এই দীর্ঘ সময় ধরে তারা একটি ঘরেই বসবাস করছে। অথচ গ্রামের আধা কিলোমিটারের মধ্যে সাফিয়া বেগমের ভাই-বোন নিয়ে আপন পরিবার রয়েছে। এখন বন্ধু-অভিভাবক এই মুক্তিযোদ্ধাই দুজনের মধ্যে চমৎকার আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন রাতে বাড়িতে ফিরতে দেরি হলে রাস্তায় দাড়িয়ে থাকে সাফিয়া বেগম এবং রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী এলাকার মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করে “ওনাকে কোথাও দেখেছ ”।
সাফিয়া বেগম মানসিক প্রতিবন্ধি হলেও গ্রামের কোন মানুষের বিপদ হলে আর্থিক নয় সহমর্মিতা নিয়ে পাশে দাড়ায়। তার সখের লালন পালন করা সব ছাগলগুলিরই জেন্ডার ভিত্তিক পৃথক পৃথক নাম রয়েছে। এদেরকে নাম ধরে ডাকলে তারা চলে আসে। জন্মের পর থেকেই এদের নাম দেওয়া হয়। বর্তমানে ময়না, কমলা, সাহেব, ছত্তার, কুরু ও ছাদমান নামের ছয়টি ছাগল রয়েছে। কোন কারনে ছাগল মারা গেলে তাদের পাশে বসে কান্নাকাটি করে এবং পানিতে ভাসিয়ে না দিয়ে কবর দেয়।
সবমিলিয়ে সৎ ও নিষ্ঠাবান চিরকুমার মোয়াজ্জেম হোসেন ও তার আশ্রয়ে থাকা ভাতা বঞ্চিত এক রকম চিরকুমারী সাফিয়া বেগমের সংসার। এই সংসারে অভাব অনটন থাকলেও সরকার বা কারো কাছে তাদের কোন প্রত্যাশা নেই। সৎভাবে জীবন যাপনের নির্ভরতাই তাদের অন্যতম চাহিদা।
এ ব্যাপারে শৌলজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ মাহমুদ হোসেন রিপন জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন ছালেকে একটি সরকারি ঘর দেয়া হয়েছিলো। সে ঘরটি তার ভাইয়ের ছেলে আওয়ামীলীগ নেতা কিবরিয়া দখল করে নিয়েছে। সাফিয়া বেগম কোন প্রকার ভাতার জন্য আমাদের কাছে আসেনি। তিনি চাইলে ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।











