জনতার খবর ডেস্কঃ করোনা মহমারির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর মেডিকেল কলেজসহ চিকিৎসাশিক্ষার কার্যক্রম সশরীরে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে একসঙ্গে সব ক্লাস শুরু না করে ধাপে ধাপে হবে। মেডিকেল কলেজের ১ম, ২য় ও ৫ম বর্ষের সশরীরে ক্লাস শুরুর সম্ভাব্য তারিখ ঠিক করা হয়েছে ১৩ সেপ্টেম্বর। পর্যায়ক্রমে শুরু হবে অন্যান্য বর্ষের শ্রেণি কার্যক্রম। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ক্লাসে অবশ্যই পরতে হবে মাস্ক। সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক সভা শেষে বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এ তথ্য জানান।
অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে রোববার আন্ত্রঃমন্ত্রণালয় সভা ডাকা হয়েছে। সেখানেই অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তুতিটা শুরু করতে বলে দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, করোনা প্রতিরোধে আরও সাড়ে ১৬ কোটি ডোজ টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আগামী জানুয়ারির মধ্যে দেশে চলে আসবে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। সরকারের সবশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, এই ছুটি ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউটসহ মেডিকেল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সের দ্বিতীয় বর্ষ ও পঞ্চম বর্ষের ক্লাস সশরীরে চালুর বিষয়ে এ সভা হয়। এতে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব আলী নূর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এনায়েত হোসেনসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরুর প্রস্তুতি নিয়েছি। এটা দু-একদিন এদিক-সেদিক হতে পারে। কোভিড বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, বিএমডিসিসহ সবার মতামতের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ আছে। অনলাইনে কিছু ক্লাস হলেও মেডিকেল শিক্ষায় সশরীরে ক্লাস নেওয়া দরকার। না হলে গ্যাপ পড়ে যাবে। আমরা ইন্টার্ন চিকিৎসক পাব না। এ কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সশরীরে ক্লাস নেওয়া দরকার। শুরুতে ১ম, ২য় ও ৫ম বর্ষের ক্লাস শুরু হবে। যেসব ক্লাসে ব্যবহারিক বিষয় জড়িত সেগুলো আগে নেব। পরিস্থিতি দেখে সব ক্লাসই চালু করে দেব।
জাহিদ মালেক বলেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অবশ্যই রোগীর কাছে যেতে হবে। এজন্য প্রথমে তারা নন-কোভিড রোগীদের কাছে যাবে। পর্যায়ক্রমে কোভিড রোগীদের কাছেও যাবে। সবই হবে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ক্লাসে গেলে মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানাসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, ছেলেমেয়েদের টিকা দেওয়ার পর স্কুল খুলে দিতে পারলে মঙ্গলজনক। সেই চেষ্টাও করা হবে। সে ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচের শিক্ষার্থীদের ফাইজার ও মডার্নার টিকা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। এসব টিকা পাওয়ার পরই আমরা শিক্ষার্থীদের দেওয়ার চেষ্টা করব। যুক্তরাষ্ট্রে মডার্না ও ফাইজারের টিকা শিশুদের দেওয়া হয়েছে। সে কারণে আমরাও ওই টিকা দিতে চাই। পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলব। কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুক্তি অনুযায়ী ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে করোনাভাইরাসের টিকা পাওয়ার ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সেরাম থেকে আমরা এখনো চুক্তির ২ কোটি ৩০ লাখ টিকা পাইনি। তবে এখনো অপেক্ষায় আছি। সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, তারা আমাদেরকে আশ্বস্ত করছেন, টিকা পাব। যদি আমরা এ টিকা না পাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের টাকা ফেরত দিতে হবে। আমরা আশা ছাড়িনি।
তিনি বলেন, অনেক দেশে এখনো টিকা কার্যক্রম পুরোদমে শুরুই হয়নি। আমরা সেটা করতে পেরেছি এবং অল্প দিনে আমাদের সরকার তিন হাজার কোটি টাকার টিকা কিনেছে। সামনে আরও কিনতে হবে। যেগুলো অর্ডার করেছি, সেগুলোও টাকা দিয়ে কিনতে হবে। সেখানেও হাজার হাজার কোটি টাকা লাগবে। আনার, রাখার, প্রয়োগ করার খরচ আছে।
তিনি আরও বলেন, টিকা পেতে এ পর্যন্ত তিন কোটি ৮৩ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন। প্রথম ডোজের নিয়েছেন এক কোটি ৮৬ লাখ ও দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৮২ লাখ মানুষ। আমাদের হাতে এক কোটি ২২ লাখ ডোজ টিকা আছে। চীনে এ পর্যন্ত সাড়ে সাত কোটি টিকার অর্ডার দিয়েছি। প্রথমে দেড় কোটি এবং কিছুদিন আগে আরও ছয় কোটি ডোজ টিকার অর্ডার দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে দুই কোটি করে আগামী তিন মাসে ছয় কোটি টিকা চলে আসবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সাড়ে ১০ কোটি টিকার একটি প্রস্তাবনা আমাদের কাছে এসেছিল। সেই টিকা কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং চুক্তি করেছি। গত ১০-১৫ দিনে বাংলাদেশ সাড়ে ১৬ কোটি টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই টিকাগুলো ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে দেশে চলে আসবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যে ছয় কোটি ৮০ টিকা কোভ্যাক্স সুবিধার মধ্যে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, তা চলমান থাকবে।
প্রতি জেলা সদর হাসপাতালে বার্ন ইউনিট হবে : সংসদ প্রতিবেদক জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, সারা দেশের প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে বার্ন ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার লিখিত প্রশ্নোত্তরে তিনি এ তথ্য জানান। এ সংক্রান্ত প্রশ্নটি উত্থাপন করেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু। অন্যদিকে কাজিম উদ্দিন আহম্মেদের আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশের ৩৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ৪ হাজার ৩৫০টি ও ৭৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ৬ হাজার ৬৫৪টি আসন রয়েছে। এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বেসরকারি হাসপাতাল স্থাপন ও পরিচালনার জন্য অধ্যাদেশ অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এটি সময়োপযোগী নয় বিধায় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ‘স্বাস্থ্য সেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৯’ শীর্ষক একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিগগিরই উক্ত আইনের রূপরেখা চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। মোরশেদ আলমের প্রশ্নের জবাবে জাহিদ মালেক জানান, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে অনুমোদিত পদ ৭২০টি। এর বিপরীতে কর্মরত জনবল ৩৭০ জন। শূন্যপদ পূরণের কার্যক্রম চলছে।












