মোঃ মোছাদ্দেক হাওলাদার,বরিশাল প্রতিনিধিঃ
বরিশালের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাবা-মা সব হারিয়েছি। সব হারিয়ে এই দেশে এসেছি। কষ্ট বুকে নিয়ে এই দেশ এই দেশের মানুষকে আপন করে নিয়েছি। পরিবার হিসেবে গ্রহণ করেছি। আর একটা পরিবারকে যেভাবে রক্ষা করতে হয়, উন্নতি করতে হয়, সেভাবেই আমি মানুষের জন্য কাজ করছি। যে স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু সেই স্বপ্নই আমি বাস্তবায়ন করতে চাই।
গতকাল শুক্রবার বিকালে বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ জনসভায় মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তার ছোটবোন শেখ রেহানা।
আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেছেন, বিএনপি আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে ধ্বংস করেছিল। ক্ষমতায় থেকে মানুষের ভাগ্য না গড়ে নিজেদের ভাগ্য গড়েছিল বিএনপি-জামায়াত। তারা মানুষের সম্পদ ধ্বংস করেছে। উন্নতি করেছে নিজের আর্থিক অবস্থা। জনগণের কথা তারা ভাবেনি। সেই দলই এখন বাসে-ট্রেনে আগুন দিয়ে ক্ষতি করছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। হুমকির মুখে ফেলছে মানুষের জীবনমাল।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনার হাত তুলে ওয়াদা করেন নৌকায় ভোট দেবেন। ‘আগামী ৭ জানুয়ারি নির্বাচন। ওই দিন সকাল সকাল সবাইকে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। আর নৌকা নূহ নবীর নৌকা মার্কা। সেই মহাপ্লাবনের সময় মানুষকে বাঁচিয়েছিল। এই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আপনারা স্বাধীনতা পেয়েছেন। এই নৌকা মার্কায় আপনাদের জীবন-মান উন্নত করেছে। কাজেই আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আপনাদের সেবা করার আরও একবার সুযোগ দেবেন। যাতে আপনাদের জীবন সমৃদ্ধ করতে পারি।’
এ সময় বরিশালবাসীর উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের জন্য সুখবর আছে, ভাঙ্গা থেকে বরিশাল-কুয়াকাটা-পায়রা পোর্ট পর্যন্ত ৬ লেনের রাস্তা তৈরি করে দিব। ইতোমধ্যে ভ‚মি অধিগ্রহনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাথে আলোচনা হয়েছে, সেখান থেকে আমরা অর্থ নিব। এই বরিশালের মানুষের আর কোনো দুর্ভোগ থাকবে না। আধুনিক রাস্তা তৈরি করে দিয়ে চলার পথ সহজ করে দিবো।
তিনি আরও বলেন, শস্যভাÐার হিসেবে বরিশালের সুনাম ফিরিয়ে আনতে চাই। বরিশালে মেডিকেল খুলে দিয়েছি, এছাড়া মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হবে।
জনসভায় বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ সভাপতিত্বে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি, বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত, উপদেষ্টা মন্ডলীর সভাপতি ও নৌকার প্রার্থী আলহাজ্ব আমির হোসেন আমু এমপি, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও নৌকার প্রার্থী রাশেদ খান মেনন, জেপি’র চেয়ারম্যান ও নৌকার প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নৌকার প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, নৌকার প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান খান, অভিনেতা মীর সাব্বির, নাট্যাভিনেতা তারিন জাহান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও নৌকার প্রার্থী আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মি আহমেদ, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, বরিশাল-৬ আসনের নৌকার প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ মল্লিক, ঝালকাঠী-১ আসনের নৌকার প্রার্থী ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীর উত্তম, ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু মোল্লা, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম জাহাঙ্গীর, সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ভিপি আব্দুল মান্নান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আফজালুল হোসেন, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান।
ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে, ওমরকে শেখ হাসিনা \ জনসভায় ঝালকাঠি-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনিত প্রার্থী ব্যারিস্টার এম শাহজাহান ওমরকে নিয়ে শেখ হাসিনা বলছেন, বিএনপি সন্ত্রাসী দল ছেড়ে শাহজাহান ওমর আওয়ামী লীগে আসছে। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসছে।
অপরদিকে এর আগে শাহজাহান ওমর তার বক্তাব্যতে বলেন, আমি আপনাদের দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। আশা করি আপনারা আমাকে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে গ্রহণ করবেন। তবে সর্বকনিষ্ঠ হলেও, আমার চেতনা জয়বাংলা কিন্তু সর্বকনিষ্ঠ নয়, এটা অনেক পুরাতন।
ওমর বলেন, বঙ্গবন্ধু শুধু দেশ স্বাধীনই করেননি। বঙ্গবন্ধুর মতো দৃঢ় নেতৃত্ব না থাকলে এ দেশ থেকে মিত্রবাহিনী যেত কি না আমার সন্দেহ। ৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় কিন্তু এখনও জাপান-কোরিয়ায় আমেরিকান আর্মি। জার্মান-কিউবাতে আমেরিকান আর্মি। বঙ্গবন্ধুর এটা বিশেষ অবদান। স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো কারণে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে হয়, তাহলে আমরা বলব বঙ্গবন্ধু এই জাতিকে একটা নিরলস-নির্ভেজাল জাতি উপহার দিয়েছেন।
বিএনপির এক দফা পল্টনের খাদে পড়ে গেছে: ওবায়দুল কাদের \ রাজনীতির মাঠে বিএনপি লাল কার্ড খেয়ে ফাউল করে বিদায় নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বরিশালে নৌকার জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি কোথায়? পালিয়ে গেছে। তো কার সঙ্গে খেলবেন? ১৮৯৬ জন (নির্বাচনের প্রার্থী) আছেন, এখনো খেলার জন্য প্রস্তুত। ওরা (বিএনপি) পালিয়ে গেছে, পল্টনের খাদে পড়ে গেছে বিএনপির এক দফা।
কাদের বলেন, খেলা হবে, জোরদার খেলা হবে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা বসে আছেন, বিজয়ের লাল সূর্যের পতাকা হাতে। ৭ জানুয়ারি বিজয়ের বন্দরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা পৌঁছাবো ইনশাল্লাহ।
তিনি বলেন, এই বরিশাল ছিল বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনের দুর্গম দুর্জয় ঘাঁটি। আজকের বরিশাল শেখ হাসিনার দুর্জয় ঘাঁটি। আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।
‘বাংলাদেশে এমন নেতা নেই, যে নেতা নির্বাচনী ইশতেহারে বলেন- অতীতে যদি ভুল করে থাকি সামনে সেই ভুল সংশোধন করবো। এমন সৎ সাহস বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কন্যা ছাড়া আর কেউই দেখাতে পারেননি। ভুল থেকে শিক্ষা নেবেন, ক্ষমতার দাপটে নেতারা এটা স্বীকার করেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা স্বীকার করেছেন। ’
৭ জানুয়ারি বিপুল ভোটের খেলা হবে উল্লেখ করে কাদের বলেন, সব সংকট-সব দুঃসময়ে, ’৭৫-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর রক্তভেজা মাটিতে শেখ রেহানা ছিলেন তার (শেখ হাসিনার) সহযোদ্ধা। আজ বরিশালের মাটিতে তারা দুই বোন পাশাপাশি বসে আছেন নির্ভয়ে। আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পান না বঙ্গবন্ধুর কন্যা, জনগণ আমাদের শক্তি। কারও হুমকি-ধমকিতে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা মাথা নত করেন না।
মিছিলে মিছিলে কর্মী-সমর্থকদের জনস্রোত \ শুক্রবার সকাল ৯টা থেকেই নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় যোগ দিতে নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সড়কের মোড়ে জড়ো হতে থাকেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, খÐ খÐ মিছিল নিয়ে বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে দলীয় নেতা-কর্মীরা সমাবেশস্থল বঙ্গবন্ধু উদ্যানে সমবেত হতে শুরু করেন। মিছিলে বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড নিয়ে নেতা-কর্মীরা নানা ¯েøাগান দিয়ে সমাবেশস্থলে আসেন। মিছিল গুলোতে নানা রঙের শাড়ি পরা নারী ও টুপি পরা পুরুষদের উপস্থিতিতে বর্ণিল হয়ে উঠেছে সড়কগুলো। বরিশালের দ্বীপ জেলা জেলা ভোলা ও মুলাদী,হিজলা, ঝালকাঠি থেকে কয়েক হাজার নেতাকর্মী আসছে লঞ্চ যোগে।
মিছিল নিয়ে জনসভা মঞ্চের সামনের নির্ধারিত অংশে নিরাপত্তা গেট দিয়ে নেতাকর্মী ও জনসাধারণকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনার সফর ঘিরে সর্বত্র উৎসবের আমেজ।
হুইলচেয়ারে করেই সমাবেশস্থলে রাকিব \ প্রধানমন্ত্রীকে শেখ হাসিনাকে একনজর দেখতে মানুষের ঢলের ঠেলে সমাবেশস্থলে উপস্থিত শারীরিক প্রতিবন্ধী ২০ বছরের যুবক রাকিব। বেলা ১২ টার মধ্যে হুইল চেয়ার নিয়ে জিলা স্কুলের মোড়ে এসে হাজির হয়েছেন তিনি। তিনি বরিশাল নগরের লুৎফর রহমান সড়কের বাসিন্দা।
রাকিব বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কাছ থেকে একনজর দেখতে চাই। কথা বলার ইচ্ছেও আছে কিন্তু তা মনে হয় সম্ভব হবে না। আর সমাবেশস্থলে আসার জন্য সদররোড পর্যন্ত গাড়িতে এসেছি। এরপর গাড়ি ঢুকতে না পারায় হুইল চেয়ারে করেই সমাবেশস্থলে যাচ্ছি। দেখি কি হয়, কতদূর যেতে পারি।
পঙ্কজ ও শাম্মী গ্রæপের সংঘর্ষে নিহত-১ আহত ৪০ \ বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বরিশাল-৪ আসনে নৌকার প্রার্থী শাম্মী আহম্মেদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী পঙ্কজ নাথের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে সিরাজ নামে এক কৃষকলীগ নেতা নিহত হয়েছে। এ সময় দু’গ্রæপে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছে। নিহত সিরাজ হিজলা উপজেলার দুলখোলা ইউনিয়ন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক লীগের সভাপতি। জানাগেছে তিনি পঙ্কজ নাথের সমর্থক।
শুক্রবার বেলা আড়াইটায় নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানে প্রধানমন্ত্রীর জনসমাবেশস্থলের সামনে এই ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে ১০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পঙ্কজ নাথের সমর্থকরা অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে প্রবেশের পরপরই শাম্মী আহম্মেদের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় তাদের বেশ কয়েকজন আহত হয়।
হামলায় কয়েকজনের মাথা ফেটে যায়। তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই হামলা করা হয়েছে জানিয়ে তারা হামলাকারীদের বিচার দাবি করেন। তবে শাম্মী আহম্মেদের অনুসারীরা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তেমন কিছু হয়নি।










