ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এনে এমপি আমির হোসেন ও শিল্পমন্ত্রীর ছোট ভাই এফ এম মাহমুদ কিরণের বিরুদ্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেছেন নলছিটি উপজেলার দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী। চেয়ারম্যান প্রার্থী সালাহ উদ্দিন খান সেলিম ও এ্যাডভোকেট জিকে মোস্তাফিজুর রহমান এ অভিযোগ করেন।
উল্লেখিত অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয় যে, প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য নেতাকর্মীদের ওপর চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমপির চাপের পাশাপাশি তাঁর সাবেক এপিএস ও বর্তমানে শিল্পমন্ত্রীর এপিএস এফ এম মাহমুদ কিরণ প্রকাশ্যে দুই উপজেলার প্রার্থীদের বিজয়ী করতে মাঠে নেমেছেন। বিভিন্ন স্থানে সভা করে ইউপি চেয়ারম্যান, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদকের নেতৃত্বে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে ভোট কারচুপির মাধ্যমে তাদের বিজয় নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্ব›িদ্ব চেয়ারম্যান প্রার্থীরা।
জানা যায়, আগামী ২১ মে ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ঝালকাঠি সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনজন চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। বর্তমান চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খান আরিফুর রহমান, সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সুলতান হোসেন খান ও শেখেরহাট ইউপি চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নুরুল আলম খান সুরুজ। এর মধ্যে ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমু সমর্থন দিয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান খান আরিফুর রহমানকে। তাকে বিজয়ী করতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আমির হোসেন আমু। ওইসব সমাবেশে প্রকাশ্যে খান আরিফুর রহমান এমপির উপস্থিতিতে নিজের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। যারা তাঁর পক্ষে কাজ করবে না, তাদের বহিস্কারের হুমমিক দেওয়া হচ্ছে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে নলছিটি উপজেলায়। এ উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তছলিম উদ্দিন চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সালাহউদ্দিন খান সেলিম ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ইঞ্জিনিয়ার জি কে মোস্তাফিজুর রহমান। এর মধ্যে স্থানীয় এমপি আমির হোসেন আমু সমর্থন দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তছলিম উদ্দিন চৌধুরীকে। এ উপজেলাতেও দলের কোন প্রার্থী না থাকলেও এমপির প্রার্থীকে বিজয়ী করতে মাঠে নামানো হচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীদের। ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে একটি সভায় আমির হোসেন আমু তছলিম উদ্দিন চৌধুরীকে বিজয়ী করতে কয়েকজন নেতাকর্মীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর কথা মতো কাজ না করলে পরবর্তীকে পরিস্থিতি খারাপ হবে বলেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে খান আরিফুর রহমান ও তছলিম উদ্দিন চৌধুরীকে বিজয়ী করার জন্য ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমুর সাবেক এপিএস ও আপন ভায়রা এবং শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদের ছোট ভাই ও এপিএস ফখরুল মজিদ কিরন। শোনা যাচ্ছে আমির হোসেন আমু তাকে ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলায় দুই প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য নির্বাচনী এলাকায় পাঠিয়েছেন। কিরন বিভিন্ন স্থানে দলের নেতৃবৃন্দ ও ইউপি চেয়ারম্যানদের নিয়ে বৈঠক করে ছবি তুলে, তা নেতাকর্মীদের ফেসবুকে দেওয়াচ্ছেন। যাতে অন্য নেতাকর্মীরা এবং প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীরা বুঝতে পারে এমপির প্রার্থী খান আরিফুর রহমান ও তছলিম উদ্দিন চৌধুরী। তাদের পক্ষে দোয়াও চাওয়া হচ্ছে। এসব ঘটনায় ঝালকাঠি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী সুলতান হোসেন খান এক ভিডিও বার্তায় স্থানীয় এমপি আমির হোসেন আমুকে দোষারোপ করেছেন। প্রভাব বিস্তার করে আমির হোসেন আমু তাঁর প্রার্থীকে বিজয়ী করতে যা কিছু প্রয়োজন, তা করে যাচ্ছেন বলেও সুলতান হোসেন খান অভিযোগ করেন।
এদিকে এমপি আমির হোসেন আমুর নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও তাঁর ভায়রা বর্তমান শিল্পমন্ত্রীর এপিএস ফখরুল মজিদ মাহমুদ কিরণের বিরুদ্ধে প্রকাশে নির্বাচনী এলাকায় নেতাকর্মীদের প্রভাবিত করায় নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নলছিটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতাকারী দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী। চেয়ারম্যান প্রার্থী সালাহউদ্দিন খান সেলিম ও অ্যাডভোকেট জিকে মোস্তাফিজুর রহমান গত ২৯ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। নির্বাচন কমিশন অভিযোগ গ্রহণ করেছেন।
এছাড়ও আমুর সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করায় এ পর্যন্ত বহিস্কার হয়েছেন সদর উপজেলার শেখরহাট ইউনিয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক স্বপন দেবনাথ, ছাত্রলীগের নলছিটির মোল্লারহাট ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন খসরু, সদরের পোনাবালিয়া ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাকিউর রহমান শাকিল, সদর উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর মল্লিক, শেখেরহাট ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। সবার বহিস্কার আদেশে উল্লখ করা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও গঠনতন্ত্র বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ। এতে অন্যান্য নেতাকর্মীদের মধ্যে বহিস্কার আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এ ব্যপারে ঝালকাঠি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী সুলতান হোসেন খান বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপক্ষে করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। দলের কোন প্রার্থী থাকবে না, দলীয় প্রতীকও থাকবে না। এ অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের আশায় আমি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছি। কিন্তু প্রার্থীতা ঘোষণার পরপরই ঝালকাঠি-২ আসনের এমপি আমির হোসেন আমু ও তাঁর ভায়রা সাবেক এপিএস এবং শিল্পমন্ত্রীর বর্তমান এপিএস ফখরুল মজিদ মাহমুদ কিরন খান
আরিফুর রহমানকে প্রার্থী সমর্থন দিয়েছেন। এটা সম্পূর্ণ দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা এ কাজ করছেন। আমি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যশা করছি জেলা প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে।
নলছিটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী সালাহউদ্দিন খান সেলিম বলেন, প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে এমপি ও শিল্পমন্ত্রীর এপিএস তছলিম উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। যেখানে দলীয় কোন প্রার্থী নেই, সেখানে নেতাকর্মীদের বাধ্য করা হচ্ছে তছলিম চৌধুরীর নির্বাচন করার জন্য।
অপর প্রার্থী অ্যাডভোকেট জিকে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান ও দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে গোপনে বৈঠক করে ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ঝালকাঠি ও নলছিটিতে মানা হচ্ছে না। আমারাও মাঠে থাকবো। নির্বাচনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাবো।
নলছিটির মোল্লারহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম মাহাবুর রহমান সেন্টু বলেন, এমপি সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ না করলে ইউপি চেয়ারম্যানদের সরকারি বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এ ব্যপারে ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমু ও বর্তমান শিল্পমন্ত্রীর এপিএস ও এমপি আমুর ভায়রা ফখরুল মজিদ মাহমুদ কিরনের ফোনে কল করলেও তাঁরা রিসিভ করেননি।
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুম বলেন, নির্বাচন কমিশনে দুই প্রার্থী অভিযোগ করেছেন শুনেছি। রিটার্নিং কর্মকর্তা তদন্ত করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন।










