জনতার খবর ডেস্কঃ অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের সভাপতি সহসী কলমযোদ্ধা নির্মল সেনের আজ নবম মৃত্যুবার্ষিকী। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৭২-৭৩ সালের শাসনামলে রক্ষীবাহিনীর সংঘাতপূর্ণ অবস্থানের কারণে দেশ যখন অস্থির সময় পার করছিল, তখন দৈনিক বাংলায় ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ নামে একটি উপসম্পাদকীয় লিখে তোলপাড় সৃষ্টি করেন। এই লেখার কারণে তিনি তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। কিন্তু সরকারের কাছে কখনো তিনি মাথা নত করেননি।
নির্মল সেন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বাকশাল গঠন করা হলে সাংবাদিক,ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী সহ পেশাজীবী নেতারা দলে দলে যোগ দেয়। তখন নির্মল সেন বঙ্গবন্ধুর মুখের ওপর বলে ছিলেন বাকশালে যোগ দেবেন না। বাকশাল করে মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে হচ্ছে । নির্মল সেন এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু আমলের শেষদিকে তিনিই নির্দেশ দিয়ে আমার লেখা বন্ধ করেছিলেন। ৭৪ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর তাঁর লেখা বন্ধের নির্দেশ এসেছিল। ‘দৈনিক বাংলার সম্পাদক তাঁকে ডেকে বললেন, প্রধানমন্ত্রী আপনার লেখা বন্ধ করেছেন।
নির্দেশ দিয়েছেন নির্মল সেনের উপসম্পাদকীয় আর দৈনিক বাংলায় ছাপা হবে না’। নির্মল সেন কেবল একজন পেশাদার সাংবাদিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নিবেদিত দেশপ্রেমিক। যার লক্ষ্য ছিল শোষণহীন ও সমতাভিত্তিক একটি সমাজ গঠন করা। কৈশোরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৯০-এ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ গন বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সব সংগ্রামে তিনি ছিলেন সক্রিয়। রাজনৈতিক কারণে তিনি ১৬ বার কারাবরণ করেন। সাংবাদিকদের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী।
১৯৭২-৭৩ সালে নির্মল সেন অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন- ডিইউজের সভাপতি ও ১৯৭৩-৭৮ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন- বিএফইউজের সভাপতি ছিলেন। তখন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী। নির্মল সেন ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতি এমই স্কুলে পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। দেশ বিভক্তির পরে নির্মল সেনের বাবা-মা অন্য ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে কলকাতা চলে যান। জন্মভূমির প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসার কারণে তিনি এদেশে থেকে যান। নির্মল সেন বড় হয়েছেন ঝালকাঠি জেলায় তার পিসির বাড়িতে।
তিনি ঝালকাঠি জেলার কলসকাঠি বিএম একাডেমি থেকে ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তিনি বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আইএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ও মাস্টার্স পাশ করেন।নির্মল সেন ছাত্র অবস্থায় ও কর্মজীবনে ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা জমিদার বাড়িতে আসেন একাধিক বার।এ এলাকার মানুষের সাথে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। তিনি ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক ছিলেন।
কিন্তু বাকশাল গঠন সহ আওয়ামী লীগের গন বিরোধী সকল কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। ১৯৬১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার মধ্যে দিয়ে নির্মল সেন তার সাংবাদিক জীবন শুরু করেন। তারপর দৈনিক আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক বাংলা পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। আজ সারা দেশ সাংবাদিক সমাজ দ্বিধা বিভক্ত।অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার ও লেখার লোকের অভাব।আজ বড়ো প্রয়োজন ছিল নির্মল সেনের মতো সাহসী কলম যোদ্ধার।গভীর শ্রদ্ধায় সাথে স্মরণ করছি আজীবন প্রতিবাদী পরোপকারী সাংবাদিক বান্ধব মানুষটিকে।












